বাম- কংগ্রেস জোট প্রসঙ্গে

পশ্চিমবঙ্গে বাম – কংগ্রেস নির্বাচনী সমঝোতা প্রসঙ্গে
গৌতম রায়
কেবলমাত্র আসন্ন উপনির্বাচনেই নয়, রাজনীতির ময়দানেও বামফ্রন্ট আর কংগ্রেস এ রাজ্যে বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে একযোগে লড়াইয়ের কথা ঘোষণা করেছে।এই ঘোষণার পর একাংশের শুদ্ধাচারীরা রে রে করে উঠেছিল।ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমি বিবাদ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায় বের হওয়ার পর গোটা দেশে ঘনায়মান সাম্প্রদায়িক সমস্যার দিকে নজর না দিয়ে , ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ রক্ষায় কেন্দ্রে সেই সময়ে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকারের ব্যর্থতার কথা তুলে সেই শুদ্ধাচারীর দল এই রাজনৈতিক সমঝোতাকে অত্যন্ত কদর্য ভাষায় আক্রমণ করতে শুরু করে দিয়েছে।
এই আক্রমণকারীদের আক্রমণের উপক্রম টা হল এই যে, একদা যেহেতু কংগ্রেস তাঁদের পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে রাজনৈতিক হিন্দু সন্ত্রাসীদের হাত থেকে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে পারে নি, তাই সাম্প্রদায়িকতা কে রোখার প্রশ্নে কংগ্রেস দল ই কার্যত সম্পুর্ণ অচ্ছুৎ হয়ে পড়েছে।এই পর্যায়ে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাবরি মসজিদের তালা ভেঙে ‘ রামলালা’ রেখে আসা থেকে শুরু করে রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হিশেবে অদূরদর্শী ভূমিকার কথা বলে , সাম্প্রদায়িকতা রোখার প্রশ্নে গণতান্ত্রিক শক্তির ভিতরে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার পরিবেশকেই তাঁরা বাতিলের তালিকাতে ফেলে দিতে চান।
প্রশ্ন হল, অনেক সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও আপাত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি গুলির সাথে একটা সাযুজ্যের পরিবেশ তৈরি করে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক এবং তাদের দোসর, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়াটা বেশি রাজনৈতিক বোধের পরিচায়ক হবে, নাকি গোটা ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরকে অতীতের কর্মকান্ডের জেরে সম্পুর্ণ ব্রাত্য করে দিয়ে দুই ধরণের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কার্যত ফাঁকা ময়দান ছেড়ে দেওয়া টা অধিক রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয়বাহী হবে?
যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনৈতিক ভাবে রোখার উদ্দেশে বহু প্রশ্ন স্বত্ত্বেও বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস যে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের দিকে ধীরে ধীরে যাচ্ছে, উপ নির্বাচনী সংগ্রামের প্রচার পর্বে মহঃ সেলিম আর অধীর চৌধুরী ই খালি একযোগে প্রচার করছেন না, দুই ভিন্ন মেরুর রাজনৈতিক শক্তির ভূমিস্তরের কর্মীরাও যখন রাজ্যের মানুষের কাছে বিজেপি আর তৃণমূল কে রোখার দীপ্ত অঙ্গীকার কে ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলতে জানকবুল লড়াই শুরু করেছেন, তখন একদল নিছক তত্ত্ববাগিশ,বাস্তবের মাটি থেকে হাজার মাইল দূরে সরে গিয়ে এই লড়াইয়ের গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচার চালিয়ে প্রকারান্তে যে বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেস কেই সব রকমের সুবিধা করে দিচ্ছে- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গত প্রায় নয় বছরের অভিজ্ঞতায় এ রাজ্যের মানুষ সার্বিক ভাবেই তৃণমূল আর বিজেপির এই সাঁড়াশি আক্রমণের হাত থেকে নিস্তার চায়।মানুষের এই বাঁচার তাগিদকে বিপথে পরিচালনা করবার জন্যে ই ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তির অতি বিশ্বস্ত বন্ধু হিশেবে এই ছদ্ম বিপ্লবীরা বাম – কংগ্রেস যৌথ লড়াইয়ের পটভূমিকাকে ঘিরে বাস্তব থেকে লক্ষ যোজন মাইল দূরে নিজেদের অবস্থান রেখে কেবলমাত্র কেতাবী বিদ্যা নির্ভর সন্দর্ভের অবতারণা করেছে।এইসব সন্দর্ভে র ভিতর দিয়ে গোটা রাজ্যে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের ছদ্ম লড়াই টি ঘিরে রাজ্যের সাধারণ মানুষের মনে ক্রমশঃ যে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হচ্ছে, সেই ধারণাটিকে পরিকল্পিত ভাবে ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অতীতে ছয়ের দশকে বামপন্থীদের পর্যুদস্ত করতে, বামপন্থাকে পর্যুদস্ত করতে যে ভাবে ছদ্ম বামপন্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল, সঙ্কীর্ণতাবাদকেই বামপন্থা হিশেবে দেখাবার চেষ্টা করা হয়েছিল, তেমন প্রবণতা এ রাজ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই নোতুন করে শুরু হয়েছে।একাংশের বাপে তাড়ানো, মায়ে খেদানোকেই প্রকৃত বামপন্থী হিশেবে তুলে ধরে , কেবলমাত্র পুস্তকনির্ভর তাত্ত্বিক বুলি কপচানোর ভিতর দিয়ে বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাতে কোনো অবস্থাতেই লড়াইয়ের পরিবেশ দানা না বাঁধতে পারে, সে জন্যে একটা জোরদার প্রচেষ্টা চলছে।
এই লড়াইয়ের পরিবেশ সম্পর্কে শুরুতেই মানুষের মনে সংশয়ের বীজ বপন করতে বিজেমূলের এই নিবেদিতপ্রাণ বন্ধুরা খুব ই তৎপর।কংগ্রেস দল সম্পর্কে রাজনৈতিক চেতনাতে এতোটুকু অদল বদল না এনেও জাতীয় রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষিতে ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা কংগ্রেস দলের সঙ্গে যৌথ লড়াইয়ের ভাবনা যে জর্জি দিমিট্রভের মূল ভাবনার পরিপন্থী নয়, এই সহজ , সরল, বাস্তবমুখী রাজনৈতিক বিশ্লেষণটি রাজ্যের একটা বড়ো অংশের মানুষ ই বুঝতে পেরে গেছেন।সহজ সত্যটা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারার ফলে সাধারণ মানুষ এই অচলায়তনের থেকে বের হয়ে আসার তাগিদে বৃহৎ গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হতে চাইছেন।
বাম – কংগ্রেস জোট প্রসঙ্গে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *