টি এন শেষন

টি এন শেষন: শেষ প্রণাম
গৌতম রায়
ভারতের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষন প্রয়াত হয়েছেন।দীর্ঘদিন তিনি আন্তরালেই বসবাস করছিলেন।সম্ভবত দক্ষিণ ভারতের কোনো একটি বৃদ্ধাবাসে ছিলেন নিঃসন্তান শেষন দম্পতি।প্রশাসন আর প্রশাসকদের উপরে দেশের মানুষের আস্থার পরিমাণটা যখন ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে, এইরকম একটা সময়ে  যিনি আমলাতন্ত্রের  অঙ্গীভূত হয়ে ও, আমলাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বেরিয়ে এসে, সাম্প্রতিক অতীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ,প্রশাসন এবং প্রশাসকদের সম্পর্কে একটা আস্থার পরিবেশ তৈরি করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেই টি এন  শেষনের গতকাল জীবনাবসান হয়েছে।
                   ভারতের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে টি এন শেষন সম্ভবত প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র বর্ণময় ব্যক্তিত্ব। দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার বাঙালি আই সি এস সুকুমার সেনের স্মৃতি এখনকার প্রজন্মের মানুষের কাছে প্রায় ঝাপসা হয়ে এসেছে। সদ্য স্বাধীন দেশে ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত- নিরক্ষর নির্বিশেষে, সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করবার লক্ষ্যে একটা সামগ্রিক রূপরেখা প্রণয়নে সুকুমার সেন যে ভূমিকা এবং অবদান রেখেছিলেন,শেষন সেই পটভূমিকা কে ই, সময়ের ,অভিজ্ঞতার নিরিখে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার দিকে উপনীত করবার চেষ্টা করেছিলেন।
                       সুকুমার সেনের   পর  বহু মানুষ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের অঙ্গন থেকে যথেষ্ট দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। তা সত্বেও দেশের প্রতিটি মানুষের নির্বাচনী অধিকারকে সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে, নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে, বিশেষ করে জাল ভোট ও ছাপ্পা ভোটকে রোখার ভাবনাকে  কেন্দ্র  করে প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন যে ভাবনা চিন্তা গুলো করেছিলেন, সেই সমস্ত পরিকল্পনাগুলোর  বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন শেষন।
                       আজকের ভারতবর্ষে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার প্রতিটি ক্ষেত্রে ভোটার কার্ডের গুরুত্বের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। অথচ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শেষন  যখন এই ভোটার কার্ড প্রণয়নের কথা চিন্তা ভাবনা করেন ,তখন দলমত নির্বিশেষে, সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরা ই এই ভোটার কার্ড প্রণয়নের ভাবনাটাকে একটা পাগলামো বলে প্রকাশ্যে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন ।
                     বামপন্থী থেকে দক্ষিণপন্থী কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ই তখন ভোটার কার্ড ঘিরে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শেষনের অনড় অবস্থানকে’ পাগলামো ‘বলতে প্রকাশ্যে দ্বিধাবোধ করেননি। ভোটার কার্ড প্রণয়ন ঘিরে সেদিন শেষনের যে অনড় অবস্থান, সেই অবস্থান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু যে ধরনের মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন, তা জ্যোতিবাবুর সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে কতখানি সংগতিপূর্ণ -তা নিয়ে ঘোরতর বিতর্ক রয়েছে।
                  শাসক-বিরোধী ,সব শিবিরের সমস্ত রকমের বিরুদ্ধতা স্বত্বেও ,প্রতিটি ভোটারের  সচিত্র পরিচয় পত্রের বিষয়টি থেকে কিন্তু শেষন  সরে আসেননি । কোনো রকম আপোষ করেননি। যে প্রশ্নগুলি রাজনৈতিক দলগুলি থেকে তোলা হচ্ছিল ,সেই প্রসঙ্গ গুলি প্রাসঙ্গিকতা যথেষ্ট ছিল। ভারতবর্ষের একটা বড় অংশের মানুষের মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই ।তাঁরা দুবেলা-দুমুঠো খেতে পান না। এইসব মানুষজন,  এই সচিত্র পরিচয়পত্র  কিভাবে  নিজেদের কাছে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন এবং পরবর্তী ভোটের সময় সেই সচিত্র পরিচয় পত্র দাখিল করে তাঁদের নাগরিক অধিকার জ্ঞাপন করবেন– এই প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠলেও ,  শেষন তাঁর আমলা জীবনের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনৈতিক দলগুলির ভোট জালিয়াতি রুখবার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ,এই উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।
                   শেষন অনুভব করেছিলেন যে ,সচিত্র পরিচয় পত্রের ভিতর দিয়ে সামগ্রিকভাবে ভোট জালিয়াতির সম্ভবপর হবে না ।তবু ভোট জালিয়াতির রুখবার জন্য এই যে উদ্যোগ ,সেটি যদি গ্রহণ করা না হয় ,তাহলে আগামী দিনে গোটা ভারতবর্ষের সমস্ত স্তরের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনব্যবস্থা কার্যত একটা প্রহসনে পরিণত হবে ।
                 এই দূরদৃষ্টি র তাগিদ থেকেই শেষন সমস্ত রাজনৈতিক দলের যাবতীয় উপহাস কে উপেক্ষা করে, সচিত্র পরিচয় পত্রের প্রশ্নে কার্যত এক গুঁয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। সচিত্র পরিচয় পত্র নিয়ে এই অবস্থানের পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসকদলের আধিপত্য খর্ব করে ,গোটা বিষয়টির ভিতরে একটি অবাধ ,সুষ্ঠু নিরপেক্ষতার পরিবেশ তৈরি করে ,সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি, প্রশাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার সময় নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় করবার ক্ষেত্রে টি এন শেষন যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা আজ সবাই ই স্বীকার করছেন।
                       সি পি আই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা  ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাদেশিক সম্পাদক গৌতম দাশ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন ;ত্রিপুরা  কংগ্রেস সরকার তাদের মেয়াদ শেষে ,নির্বাচনের সময়ে ভয়াবহ ভোট ডাকাতির উপক্রম করেছিল। যে পদ্ধতিতে তারা তাদের রাজ্যের বিগত নির্বাচনে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে , তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সন্তোষমোহন  দেবের নেতৃত্বে ভোট ডাকাতির ভিতর দিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিল ত্রিপুরা রাজ্যে ,সেই পদ্ধতি পুনঃ প্রয়োগের  যাবতীয় ষড়যন্ত্র ত্রিপুরার তৎকালীন কংগ্রেস সরকার করে ফেলেছিল ।
                   গোটা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে  দেশের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শেষন কে জানায় ত্রিপুরার সেই সময়ের বিরোধী বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি। সঠিক তথ্য প্রমাণ পাওয়ার পর, সেই নির্বাচনকে যথাযথ করতে ,সমস্ত মানুষ যাতে সুনির্দিষ্টভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন ,তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, রাজনৈতিক দল পরিচালিত প্রশাসনকে অতিক্রম করে, দেশের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যে দায়িত্বভার অর্পণ করেছে ,সেই দায়িত্বভারের   সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে, ত্রিপুরা একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার যাবতীয় ব্যবস্থা মূলত শেষন  উদ্যোগী হওয়া তেই সম্ভবপর হয়েছিল।
                সেই নির্বাচনে সাধারণ মানুষ অবাধে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ফলে ,বামপন্থীরা সে রাজ্যে আবার ক্ষমতাসীন হয় ।টি এন শেষনের  মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে সি পি আই (এম)  ত্রিপুরা রাজ্য কমিটির সম্পাদক গৌতম দাশের   এই মূল্যায়ন একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত হিসেবে বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক সময়ের বুকে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ।
             সচিত্র পরিচয় পত্র ঘিরে শেষনের ভূমিকা নিয়ে জ্যোতি বসুর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আজও বহু মানুষ নানা ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্যের ভেতর দিয়ে বামপন্থীদের অসন্মান ,অমর্যাদা করে থাকে ।কিন্তু বামপন্থীরা যে ইতিহাসের নির্মম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির ভিতর একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়– সেই কথাটি আজ শেষনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে সেদিনের ত্রিপুরায় অবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে শেষনের  নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে গৌতম দাশেল র শ্রদ্ধার্ঘ্যের  ভিতর দিয়ে ফুটে উঠেছে।
                শেষন যে নির্বাচন পরিচালনার  বিষয়াবলীকে অবাধ করবার তাগিদে সচিত্র পরিচয় পত্রের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই উদ্যোগটি ও সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এ কথা বলা যায়না। কারণ, নানা সময় ,নানা ভাবে নকল পরিচয় পত্র তৈরীর নানা খবর আমরা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ভিতর দিয়ে জানতে পারি। তা স্বত্ত্বেও বলতে হবে ; জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে ভি পি সিং য়ের প্রধানমন্ত্রীত্ব  কালে হরিয়ানার মেহাম নির্বাচন কেন্দ্রের নির্বাচনী অনাচার  ঘিরে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের ভিতরে যে প্রবল হতাশার পরিবেশ রচিত হয়েছিল, তার জের নির্বাচনী পরিমণ্ডলকে অতিক্রম করে প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়তে শুরু করেছিল ।
              গোটা বিষয়টি  দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভয়াবহ বিপদের সম্ভাবনা তৈরি ইঙ্গিত দিচ্ছিল ।এই প্রেক্ষিত কে প্রতিরোধ করে ,প্রশাসন, আমলাতন্ত্রের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে টি এন শেষন  একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছেন। শেষন  মুখ্য নির্বাচন কমিশনার থাকাকালীন দু-একটি জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও, মূলত পোস্টাল ব্যালটের ই প্রচলন ছিল তখন।
              এখন ভারতবর্ষের প্রায় সবকটি নির্বাচনে ই  ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হয়। এই ইভিএম ঘিরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নানা ধরনের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে ইভিএম ঘিরে যে ধরনের মন্তব্য করছেন ,তাতে ইভিএমে নিরপেক্ষতা ঘিরে সাধারণ মানুষের সংশয়ী  হয়ে ওঠাটা বিচিত্র কোনো ব্যাপার নয়।
                এই সংশয় দূর করবার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত কোনো দৃঢ় অবস্থান নেননি। ইভিএম ঘিরে যে অভিযোগ, সেটির  কোনো সারবত্তা আছে কিনা ,তা নিয়ে সুস্পষ্টভাবে নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত প্রকাশ্যে কিছু বলেননি ।
              অপরপক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রকাশ্যে যে বলছেন, মানুষ ইভিএমের যে বোতামটি টিপুক  না কেন, তাদের চিহ্নেই ভোট যাবে –এইরকম কথা বলবার পরেও ,কিন্তু সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সেই নেতাদের কোনো রকম সতর্কতা বা শাস্তিমুলক ব্যবস্থা হচ্ছে না। ফলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ভেতরে ইভিএম যন্ত্র ঘিরে একটা সংশয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
                 বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  বারবার দাবি জানিয়েছেন; ব্যালট নিষিদ্ধ করে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের। তিনি তাঁর মুখ্যমন্ত্রীদের দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে আবার ইভিএম থেকে ব্যালটে ফেরার দাবি জানাচ্ছেন প্রকাশ্যে ।তাই সাধারণ মানুষের কাছে এখন বারবার মনে হচ্ছে টি এন শেষনের  মত একজন ব্যক্তিত্ব যদি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব থাকতেন ,তাহলে হয়তো এই সংশয়ের  পরিবেশটা তৈরি হতো না ।
                    বস্তুত শাসককে তোয়াক্কা না করে, নিজের বিবেক অনুযায়ী, সততার সঙ্গে ,প্রশাসনে নিজের ভূমিকা পালন করবার যে দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক অতীতে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শেষন  রেখে গেছেন ,তেমন ভূমিকা তে কোনো আমলাকে আবার দেখবার জন্য হয়তো আমাদের আরও বহুকাল অপেক্ষা করে থাকতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *