প্রশ্নের মুখে ধর্মনিরপেক্ষতা

প্রশ্নচিহ্নের মুখে ধর্মনিরপেক্ষতা
গৌতম রায়
ভারতবর্ষের প্রবাহমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান কে উৎপাটিত করে, ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী আরএসএসের কাঙ্খিত ‘হিন্দুরাষ্ট্র ‘কায়েমের লক্ষ্যে আইন-আদালতের স্বীকৃতির একটি প্রথম ধাপ হিসেবে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ,সন্ত্রাসী কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমির উপরে রাম মন্দির নির্মাণের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক উচ্চারিত সিদ্ধান্তকে চিহ্নিত করতে পারা যায়।
                 একুশ শতকের প্রায় মধ্যভাগে একটি ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত অপর ধর্মের একটি ধর্মস্থান, একাংশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত কর্তৃক ধ্বংস করে দেওয়ার পর ,সেই ধ্বংসস্তুপের উপর অপর কোনো ধর্মের ধর্মস্থান নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে দিতে পারেন –এটা আধুনিক সভ্যতা বিশ্বাস করতে পারেনা ।যে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মস্থান ধ্বংস করেছে রাজনৈতিক হিন্দুরা, সেই মুসলমানদের উপাসনা গৃহ অন্যত্র নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছে  দেশের সর্বোচ্চ আদালত– এটা ভাবা যায় না।সেই ধ্বংসস্তুপের উপরে ই মসজিদ টি পুনর্নির্মাণের নির্দেশনা না দিয়ে সেটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তৈরি করার নির্দেশ দিচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত– এটাও বোধহয় আধুনিক বিশ্বের কাছে কল্পনাতিত ।
                 প্রচলিত হিন্দু ধর্মে যাঁরা বিশ্বাস করেন ,তেমন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করেন, অযোধ্যার হেনো জায়গা নেই , যেখানকার মাটি দশরথ নন্দন ,রাম কাহিনীর নায়ক রামচন্দ্রের পদধূলি ধন্য নয় ।এই বিশ্বাসের জোর থেকে বহুত্ববাদী ভারতবর্ষের মানুষ ,সমন্বয়ী চেতনার অভিশ্রুতি তে রঞ্জিত ভারতবর্ষের মানুষ, যুগ যুগ ধরে হিন্দু মুসলমান পরস্পর পরস্পরের পাশাপাশি থেকেছেন।একে অপরের দুঃখ যন্ত্রণাকে ভাগ করে নিয়েছেন।
                 ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে হিন্দু মুসলমানের এই সম্মিলিত ধারাকে বিভাজিত করবার লক্ষ্যে ই অযোধ্যায় নানা উপক্রম নিয়েছিল ,সে কথা চলতি রায় সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন ।অথচ ,এই কথা স্বীকার করে ও  তাঁরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাজক প্রক্রিয়াটির ই  যেন একটি আধুনিক পদক্ষেপ রচনা করলেন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের জমির উপর রাম মন্দির নির্মাণের কথা বলে।
                     বাবরি মসজিদের উপর  কেবলমাত্র রাম মন্দির নির্মাণের কথা বলেই সুপ্রিমকোর্ট থেমে থাকেননি ।দেশের মহামান্য প্রধান আদালত ভারত সরকারের কাছে এই মন্দির নির্মাণের কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা রচনা র সময়সীমা পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছেন। আদালতের রায়ের এই অংশটি পড়তে পড়তে কোনো কোনো সময় এমনটাই মনে হচ্ছে যে; এটি সুপ্রিম কোর্টের গর্ভগৃহ থেকে উচ্চারিত কোনো অনুদ্ধান ?নাকি, নাগপুরের কেশব ভবনের   কোনো  সন্দর্ভ  পাঠ করছি ?
                  যে রাজনৈতিক শক্তি আজ ভারতবর্ষের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রয়েছেন, তারা ‘ সাম্প্রদায়িকতা’কে তাদের ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার-প্রসার ও প্রয়োগ করে চলেছেন ।সেই লক্ষ্যেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, সেই ক্ষমতা কে চিরকালীন করে নেওয়ার অভিপ্শা থেকে, ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির যে গতিধারা, তার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় কতখানি পৃথক, তা নির্ণয় করাই যেন আমাদের পক্ষে খুব বড় রকমের মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
                     যে বিজেপি আজ একক গরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র শক্তিতে আসীন হয়ে রয়েছে ,তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএসের   তাত্ত্বিক ভিত্তি র অন্যতম প্রধান নির্মাতা এম এস গোলওয়ালকার’ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ বলে যে তত্ত্বের  সৃষ্টি করেছিলেন ,সেই তত্ত্বকে অবলম্বন করেই রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি, তাদের যাবতীয় রাজনৈতিক- সামাজিক- অর্থনৈতিক- সাংস্কৃতিক- ধর্মীয়- ধ্যান-ধারণাকে পরিচালিত করে থাকে।
                     গোলওয়ালকারের এই ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’র মূল কথাই হল ;ভারতবর্ষ হবে আরএসএসের   ধ্যান ধারণা অনুযায়ী ,তাদের শংসাপত্র গলায় লটকে থাকা মানুষজন , তারা হিন্দু বলে পরিচিত হবেন। তাদের একমাত্র বাসস্থান হবে ভারতবর্ষ। এই হিন্দুরা ভারতবর্ষের যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত ধ্যান-ধারণায় হিন্দুসমাজ যে বহুত্ববাদী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাস করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমান- শিখ- জৈন -পারসিক- খ্রিস্টানের   সমন্বয়ী  ধারায় অবগাহন করে এসেছে, তেমন হিন্দু হবে না।
                  এই আরএসএস নির্দেশিত রাজনৈতিক হিন্দুরা হবে প্রবল ভাবে পরধর্ম, পরমত অবিশ্বাসী ।তার থেকেও বড় কথা ভয়ঙ্কর রকমভাবে মুসলিমবিদ্বেষী ।এই মুসলিম বিদ্বেষ টি ই আরএসএস তাদের অভিধান অনুযায়ী যথার্থ হিন্দুর যথার্থ স1জ্ঞা বলে মনে করে থাকে ।এই সংজ্ঞা অনুযায়ী মধ্যকালীন ভারতের সমন্বয়ী সাধক   খাজা মইনুদ্দিন চিশতী থেকে সেলিম চিশতী ,কবীর , নানক , তুকারাম ,আদম পীর,  আবালসিদ্ধি  পীর , একদিল পীর,  ওলাবিবি,  কান্ত দেওয়ান , কালু পীর , খাষ পীর, খুড়ি পীর,   গোরাচাঁদ পীর,  চম্পাবতী ,ঠাকুরবর  সাহেব,  তিতুমীর,  দাদাপীর সাহেব  কিংবা বাংলার প্রাণের নিমাই শ্রী চৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ,  সারদা দেবী , বিবেকানন্দ– তাঁরা কেউই যথার্থ ভারতবাসী নন।
                  ভারতবর্ষের যে ঐতিহ্যের সংজ্ঞা আরএসএস তৈরি করেছে ,সেই ঐতিহ্যের সংজ্ঞা ,সংস্কৃতিক দ্যোতনার  সংজ্ঞায় সমন্বয়ী চেতনার এইসব মানুষেরা কখনো পড়েন না ।মধ্যকালীন ভারতের সমন্বয়ী চিন্তা-চেতনার একটি জাতীয় সৌধ হিসেবে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ, ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে যে উদার, মানবতাবাদী, ইতিহাস বোধের পরিচয় দিচ্ছিল ,সেই পরিচয়ের কফিনে শেষ পেরেক আটবার কাজটি হয়তো বা আজ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হল।
                  আউল বাউল সহজিয়া থেকে শুরু করে শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা দেবী ,স্বামী বিবেকানন্দ প্রমূখ ব্যক্তিত্বরা যে পরমত সহিষ্ণুতা ,পরধর্ম সহিষ্ণুতা ,সব মত ,সব পথের ভিতর দিয়েই পরম কারুনিকের   স্নেহের ছায়ায় উপনীত হওয়ার রাস্তা দেখিয়েছেন– সেই রাস্তা থেকে ভারতবর্ষকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে, ভারতবর্ষকে কেবলমাত্র আরএসএস নির্দেশিত রাজনৈতিক হিন্দুদের আবাসভূমি হিসেবে ,বলপূর্বক প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই যেন ,ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপর রাম মন্দির নির্মাণের এই সিদ্ধান্ত ।
               দীর্ঘদিন ধরেই ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের সার্বিক পরিকাঠামো গুলি এক ভয়াবহ সংকটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় কালে যে ঘোষিত অবরোধ ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল ,তার থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি আজ গোটা ভারতবর্ষের জুড়ে সার্বিক অবরোধের ভিতর দিয়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে ।সর্বক্ষেত্রে ই গণতন্ত্রের প্রায় প্রতিটি স্তম্ভ আজ ভূলুণ্ঠিত। সংবাদমাধ্যমের একটা বড়ো অংশ  শাসক শক্তির কাছে কার্যত মাথা নুইয়ে বসে আছে ।
                 সুপ্রিম কোর্টের আজকের অভিমতের  পর বিবেক বোধ সম্পন্ন, ধর্মনিরপেক্ষ ,গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি ভারতবাসীর কাছে আইন-আদালতের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে কতখানি আস্থা  অটুট থাকবে তা নিয়ে নানা মহল থেকে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজের উপর শারীরিক নির্যাতনের যে ফর্মুলা ভারতবর্ষের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন গুজরাট গণহত্যার’ কালে নিয়েছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর, সেই ফর্মুলা থেকে খানিকটা কৌশলগত অদল-বদল ঘটিয়ে, গোটা দেশজুড়ে মুসলমান সমাজের উপর এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করেছেন।
                 মোদির প্রথম দফার প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে কইরানা  কে  কেন্দ্র করে মুসলমান সমাজের উপর তৈরি করা অর্থনৈতিক অবরোধের বিষয়গুলি আমরা দেখেছি ।ধীরে ধীরে গোটা ভারতবর্ষকে কইরানাষতে পরিণত করবার লক্ষ্যে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি আদাজল খেয়ে নেবে পড়েছে। এন আর সি র নাম করে আজ হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন রেখা কে তীব্র করে, কেবলমাত্র ভারতবর্ষের নাগরিকদেরই তারা সংকটাপন্ন করতে চায়, তা নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ,গণতান্ত্রিক সরকারকে ও তারা সব রকম ভাবে বিপদাপন্ন করে, সে দেশের সংখ্যাগুরু মৌলবাদী শক্তিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলতে চায়। এই ভাবেই  গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক শক্তি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, তাদের শ্রেণীর স্বার্থের কেই অগ্রাধিকার দিয়ে ,আজ পথে নামতে চলেছে।
                     আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় খ্রিস্টান মৌলবাদীদের কর্মসূচি  হিসেবে পবিত্র ইসলামকে অসম্মানিত, অমর্যাদা করার  নোংরা ,গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ভারতবর্ষের সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক শক্তি যে সেই ষড়যন্ত্রের বাইরে নয় -একথা আমরা অনেকদিন ধরেই উপলব্ধি করতে পারছি। সেই ষড়যন্ত্রের বাতাবরণ যে বাবরি মসজিদের জমি বন্টন কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টের আজকের রায়ের  পর আরও অনেক বেশি প্রলম্বিত হবে –সে কথা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না।
                     পশ্চিমবঙ্গ আজ ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা এবং তার সর্বশেষ লেজুড় ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার পারস্পরিক ভাগবাটোয়ারার এক অবাধ মৃগয়া ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই পরিবেশকে আরো বিস্তৃত করবার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপর রাম মন্দির নির্মাণে  আরএসএস – বিজেপি সহ গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের দাবির প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সম্মতি প্রদান নিঃসন্দেহে একটা ভয়াবহ ভূমিকা পালন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *