মধ্য প্রদেশে কেমন চলচে কংগ্রেস সরকার

মধ্যপ্রদেশে বিজেপির কর্মসূচি রূপায়ণেই ব্যস্ত কমলনাথের সরকার গৌতম রায় খবরে প্রকাশ,  মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার তাঁদের রাছ্যে ১০০০ টি গরুর বাসগৃহ তৈরি করতে চলেছেন ।এ প্রসঙ্গে’ প্রকল্প গোশালা অন্তর্গত পরিকল্পনায় মধ্যপ্রদেশে  কংগ্রেসের  কমল নাথের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা সে রাজ্যে সাত লক্ষ গরুর বাসস্থানের নির্মাণের জন্য এই এলাহী কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন ।এই কর্মকান্ডের ব্যাপ্তি মধ্যপ্রদেশের গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা সে রাজ্যের কংগ্রেসের সরকার নিয়েছেন।
                      কোনো  অবস্থাতেই  যাতে গরুকে ‘আওয়ারা ‘, অর্থাৎ;  অসহায়-  অনাথ না ভাবা হয় ,সেই মানসিকতা নিয়েই এই প্রকল্পের সূচনা বলে মধ্যপ্রদেশের পশুপালন , পশু চিকিৎসা দপ্তরের ডাইরেক্টর আর কে রে রোকডে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন ।এই প্রসঙ্গে তিনি প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন;  নিরাশ্রয় কে আশ্রয় প্রদান করা সব থেকে বেশি দরকারি কাজ ।
                         বন্ধু, গুলিয়ে ফেলবেন না, মধ্যপ্রদেশে কিন্তু এখন বিজেপি সরকার নেই ।রয়েছে খাতায় কলমে অসাম্প্রদায়িক ,ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেস দলের নেতৃত্বাধীন সরকার। গত ডিসেম্বরে(‘১৮)  সেখানকার বিজেপি সরকারকে হারিয়ে কমল নাথের নেতৃত্বে কংগ্রেস মধ্য প্রদেশ সরকার গঠন করে। যদিও সদ্যসমাপ্ত সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে গত ডিসেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কোনো অবস্থাতেই ধরে রাখতে পারেনি কংগ্রেস ।
                     মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের আধিকারিকদের সূত্রে জানা গেছে যে, গরুদের আশ্রয় স্থল তৈরি করবার জন্য যে গোশালা তৈরি করা হচ্ছে তার এক একটি  টি তে মধ্য প্রদেশ সরকার তিরিশ লাখ টাকা করে খরচা করছেন। সরকারি মুখপাত্র প্রকাশ্যে জানিয়েছেন , এইসব গোশালা গুলি নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন মন্দির কর্তৃপক্ষ অকাতরে জমি দান করেছে ।
                     পাঠক আবার ভুলে বিনোবা ভাবের আমলের ভূদান যজ্ঞের স্মৃতি তে মনকে ভারাক্রান্ত করবেন না ! সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে,  বহু পৃথক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও গোশালা তৈরি করবার জন্য অকাতরে জমি দান করা হয়েছে ।যদিও এই পৃথক গোষ্ঠীগুলি কাদের দ্বারা পরিচালিত, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মধ্যপ্রদেশ সরকারের কোনো মুখপাত্র দেননি ।
                  তাই এইসব পৃথক গোষ্ঠীগুলির আড়ালে সংঘের নীরব অথচ সোচ্চার উপস্থিতির সম্ভাবনা কে কোনো অবস্থাতেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মধ্যপ্রদেশ সরকারের মুখপাত্রের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে,  প্রতিটি গোশালা তে  ১০০ টি করে ন্যূনতম গরু রাখার বন্দোবস্ত হবে এবং প্রতিটি গরুর জন্য গড়ে ২৭  স্কোয়ার ফুট করে জায়গা রাখা হবে ।পৃথক পৃথক শেডের নীচে এই জায়গার বাইরে ও এক একটি গরুর অবাধ বিচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকোষ্ঠ গুলির মধ্যে আলো ৫০  স্কোয়ার ফিট করে জায়গা রাখা হবে ।
                            সদ্যোজাত গরুর জন্য ওইসব গোশালা গুলিতে পৃথক ব্যবস্থা রাখার কথা ও মধ্যপ্রদেশ সরকারের মুখপাত্র প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। গোমূত্র এবং গোময় সংরক্ষণের জন্য আলাদা করে ট্যাংক নির্মাণ করা হবে। 
                     গোবর  থেকে গোবর গ্যাস তৈরি বা বিভিন্ন রকমের জৈবিক সার তৈরীর কথা আমরা সবাই জানি ,কিন্তু গোমূত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার সম্বন্ধে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা  অনেক কথা বললেও, এসব কথার আদৌ কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই ।কোনরকম সার ইত্যাদির কাজে গোমূত্রের ব্যবহারের কোন দিশা আজ পর্যন্ত কৃষি বিজ্ঞানীরা রাখেননি ।
                 তাই কোন উদ্দেশ্য নিয়ে গোমূত্র সংরক্ষণ করা হবে, গোমূত্র সংরক্ষণের জন্য ট্যাংক তৈরি করা হবে ওইসব গোশালা গুলিতে, তার কোনো সদুত্তর কিন্তু মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের মুখপাত্র আদৌ দেননি। সরকারি মাধ্যম থেকে জানা গেছে, প্রতিটি গরুর জন্য গড়ে কুড়ি টাকার ও বেশি দৈনিক খরচ করা হবে।
                                মধ্যপ্রদেশে ক্ষমতায় আসার পর কমল নাথের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার কেবলমাত্র গোশালা নির্বাণ নির্মাণ এবং গরুদের সেবা যত্নের জন্য এ বছরের বাজেটে ১৩২  কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প গোশালা নির্মাণের জন্য  ব্যাপক অর্থ কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন নরেন্দ্র মোদি সরকার তৈরি করেছে। এই প্রকল্প বাবদ কেন্দ্রীয় বাজেটে ৩০০ কোটি টাকা মোদি সরকার  বরাদ্দ করেছে।
                          সেই প্রকল্পের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মধ্য প্রদেশ সরকার যে এই গরুর আশ্রয়স্থল নির্মাণের প্রকল্প টি হাতে নিয়েছেন সে কথা জানাতে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস মন্ত্রিসভার আস্থাভাজন আমলা আর কে রকডে  দ্বিধাবোধ করেননি। এই প্রকল্প গুলি রূপায়ণে গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহায্য যে খুব সক্রিয় ভাবে নেয়া হবে, তার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকে যে যুক্ত করা হবে –সেকথাও মধ্যপ্রদেশ সরকারের মুখপাত্র জানিয়েছেন।
                     তার পাশাপাশি জেলা গোপালন সমিতি, জেলা কালেক্টরেটের  নেতৃত্বে শক্তিশালী করে তোলার সরকারি সিদ্ধান্ত যে মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস সরকার নিয়েছেন ,সে কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে সংশ্লিষ্ট সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন,  এই প্রকল্পের জন্য আমরা বছরে চারবার সংশ্লিষ্ট গোশালা গুলিকে অর্থ সরবরাহ কর।
                              এই ঘটনা ক্রম  পড়ে পাঠক হঠাৎ ভুল বুঝবেন না ।মধ্যপ্রদেশে কিন্তু এখন ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার। যে সরকারের  মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা কমলনাথ ।বিজেপি কে হারিয়ে মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের সরকার গঠন করার পরও সেখানকার সামাজিক পরিস্থিতির যে ছবি গরুদের জন্য আবাস নির্বানের সরকারি পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে রাখা হলো, তার থেকেও আরো এক মর্মস্পর্শী ছবি ফুটে ওঠে মধ্যপ্রদেশ সরকারের ই একজন প্রথম সারির আমলা নিয়াজ খানের জীবন যন্ত্রণা চিত্রের ভেতর দিয়ে ।
                                মধ্যপ্রদেশ সরকারের এই প্রথম সারির আমলা তাঁর নিজের রাজ্যে এবং গোটা দেশে নিজের ও তাঁর পরিবারের সামাজিক, আর্থিক, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের ইসলামী ও নামটি পরিবর্তন করে এমন কোনো নাম নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে নামের দ্বারা সাধারণভাবে নিয়াজের ধর্মপরিচয় মানুষ জানতে পারবে না।
                 নিয়াজ নিজেই প্রকাশ্যে টুইট করে জানিয়েছেন,  তিনি এমন কোনো নাম নিতে চান,  যে নামে কোনো মুসলিম পরিচয় থাকবে না ।ফলে তিনি একটা বড় অংশের মানুষের মুসলিম বিদ্বেষী হিংসার হাত থেকে নিজেকে এবং তাঁর পরিবারকে বাঁচাতে পারবেন ।তিনি জানিয়েছেন , এই ছদ্মনাম তাঁকে রাজনৈতিক হিন্দুদের ভয়াবহ হিংসার হাত থেকে হয়তো বাঁচাতে পারে।
                 এই প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম পরিচয়বাহী পোশাক, টুপি, কুত্তা ইত্যাদি পরিধানের ভাবনা থেকেও সরে আসার বেদনাবহ মানসিক সিদ্ধান্তের কথা কংগ্রেস পরিচালিত মধ্যপ্রদেশে বসে প্রকাশ্যে টুইট করে জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন ;  মধ্যপ্রদেশে তো বটেই, ভারতবর্ষে এমন কোনো সংস্থা নেই , যে সংস্থা মুসলমানকে তাঁর সামাজিক, আর্থিক,শারীরিক,  সংস্কৃতিক, ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতার হাত থেকে বাঁচায়। বিশেষ করে শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি নিয়াজ খান বারবারই উল্লেখ করেছেন।
                     এখানেই তিনি থামেননি। গভীর বেদনার্ত চিত্তে তিনি বলেছেন; মুম্বাইয়ের বিনোদন জগতের শিল্পীদেরও নিজেদের পেশার নিরাপত্তার স্বার্থে মুসলমানি নামকরণের থেকে সরে আসা দরকার , তা না হলে তো তাঁদের পেশার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবেই না, এমনকি তাঁদের প্রাণ সংশয় পর্যন্ত ঘটবে।
                        মধ্যপ্রদেশে গত   ২০১৮  সালের ডিসেম্বরে সরকার বদল হওয়ার পর ,কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাসীন হলে,  জানুয়ারি মাসে (‘১৯) সামাজিক গণমাধ্যমে কেবলমাত্র মুসলমান হওয়ার নিরিখে কি ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক,  শারীরিক হেনস্তার শিকার মুসলমানদের হতে হয়, সেই সম্পর্কে সে রাজ্যের এই শীর্ষস্তরের আমলা নিয়াজ খান সরব হয়েছিলেন।
                         নিয়াজ খানের এই টুইট থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে ,মধ্যপ্রদেশে উগ্র রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি ক্ষমতা হারালে ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন যে সরকার সেখানে ক্ষমতাসীন হয়েছে , সেই সরকার ক্ষমতা পরিচালনার স্বার্থে উগ্র হিন্দুত্বের মোকাবিলায় নরম হিন্দুত্বের পথে হেঁটে মধ্যপ্রদেশে এমন একটি পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করেছে , যার জেরে,  একদিকে যেমন সেখানকার রাজ্য সরকার আরএসএস-  বিজেপির কর্মসূচি গোরক্ষা ইত্যাদির সহায়ক হিসেবে গো আবাসন   তৈরি করছে, সেই আবাসনের জন্য বাজেটে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করছে ,অপরদিকে নিয়াজ খানের মতো প্রথম সারির আমলা,  সামাজিকভাবে যাঁদের অবস্থান একদম উচ্চ শ্রেণীতে, তাঁদের এই নিরাপত্তাহীনতায় ভেতর দিয়ে এই জিনিসটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে ,সে রাজ্যে উচ্চ -নীচ,  ধনী-দরিদ্র ,শিক্ষিত- নিরক্ষর — নির্বিশেষে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কি নিদারুন আর্থিক,  শারীরিক , সামাজিক , সাংস্কৃতিক,  ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতায় ভিতরে দিন কাটাচ্ছে। এই দুটি ঘটনাক্রমের ভেতর দিয়েই একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, গত ডিসেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনে সে রাজ্যের তৎকালীন বিজেপি সরকারের দুর্নীতি ,ব্যর্থতার জেরে বিজেপি মধ্যপ্রদেশে পরাজিত হলেও হিন্দু সাম্প্রদায়িক ,মৌলবাদী রাজনীতির যে ভয়াবহতা,  মুসলিম বিদ্বেষের যে আতঙ্ক রাজনৈতিক হিন্দুরা মধ্যপ্রদেশ ,ছত্রিশগড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল , সেই আতঙ্ক দূর করবার ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের সরকার দুটি রাজ্যের কোনো রাজনৈতিক , প্রশাসনিক বা সামাজিক উদ্যোগ নেয়নি ।
                     এই উদ্যোগ  না নেওয়ার জেরেই  গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্রিশগড়ে অল্প কিছুদিন আগের বিধানসভা নির্বাচনের শোচনীয় পরাজয়ের জের কাটিয়ে উঠে আশাতিত ভালো ফল করতে পেরেছে ।কংগ্রেসের এই নরম সাম্প্রদায়িকতা মধ্যপ্রদেশ,  ছত্রিশগড়ের  গণ্ডি অতিক্রম করে গোটা ভারতবর্ষে একদিকে যেমন ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কাছে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করছে,  অপরদিকে উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী হিন্দু মুসলমান উভয় শিবিরকেই শক্তিশালী করে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *