জাতীয়তাবাদ বনাম রাষ্ট্রবাদ

‘ জাতীয়তাবাদ’ বনাম ‘ রাষ্ট্রবাদ’
গৌতম রায়
ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ঊষা লগ্নে যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয়েছিল , বহু সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও সেখানে ভারতের প্রবাহমান বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সমন্বয়ী ধারার সঙ্গে কোনো সংঘাত ছিল না।প্রথম যুগের জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বিপিনচন্দ্র পাল’ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।কিন্তু সেই ধারণার ভিতরে এতোটুকু পরমত, পরধর্ম বিদ্বেষী মানসিকতা ছিল না।
বঙ্গভঙ্গের কালে অবনীন্দ্রনাথ যে ‘ ভারতমাতা’ (১৯০৫ সালে) এঁকেছিলেন, সেখানে ‘ নেশন’ বোধের চাইতেও ‘ বঙ্গমাতা’ বোধ ছিল প্রবল।এই ছবি আঁকার কালে নিজের কন্যার মুখচ্ছবি ই অবনীন্দ্রনাথের মনে সবার আগে ঠাঁই পেয়েছিল( The Makeing of a New ‘ Indian ‘ Art,Artist, Aesthetiecs and Nationalism in Bengak1850-1920 by Tapati Guha Thakueata[ Cambridge], page-255-258)।
জাতীয় আন্দোলনে থেকে যে ‘ জাতীয়তা’র ধারণা আমরা পেয়েছি, সেই ‘ জাতীয়তা’ ধারণা  আর আজ রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের ‘ জাতীয়তা’ র পরিবরাতিত রূপ ‘ রাষ্ট্রবাদে’ র ধারণা সম্পুর্ণ আলাদা।
বিপিন পালের ‘ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ আর গোলওয়ালকরের ‘ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’র চিন্তা, চেতনা, আদর্শগত ভিত্তি একদম ভিন্ন।
                      জাতীয় আন্দোলনের কালে উদ্ভূত জাতীয়তাবাদের মূল লক্ষ্য ই ছিল সীমাবদ্ধ পরিসরের ভিতরেও লিঙ্গ সাম্যের প্রতি আবেগ পূর্ণ।সেখানে মাতৃতান্ত্রিকতাকে প্রধান্য দিয়ে মাতৃতান্ত্রিকতার ভিতর দিয়ে লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতি ঘৃণার উদ্রেকের সুতিকা প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছিল।
                  আর রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবির জাতীয় আন্দোলনের নির্যাষ ‘ জাতীয়তাবাদে’র বিকৃত উপস্থাপনায় যে ‘ রাষ্ট্রবাদ’ কে তুলে ধরে, সেই চিন্তার মূল লক্ষ্য ই হলো লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে , নারীর অধিকারকে সঙ্কুচিত করে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করা।
জাতীয় আন্দোলন যে ‘ জাতীয়তাবাদে’র উপর ভিত্তি করে তার একটি বিশেষ ধারাকে পরিচালিত করেছিল, সেই চিন্তার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ‘ জাতীয়তাবাদে’ র পরিবর্তিত রূপ,’ রাষ্ট্রবাদ’যে সম্পুর্ণ পৃথক, আমাদের জাতীয় আন্দোলন কালের ‘ জাতীয়তাবাদী’ চেতনার একটি বিকৃত উপস্থাপনা– এটা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা, তাঁদের বোঝানো– প্রতিটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষের এখন একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
                       জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে প্রথম কুড়ি বছর ( ১৮৮৫-১৯০৫) , যে সময়কালটিকে জাতীয় কংগ্রেস তথা সমকালীন রাজনীতির আবেদন- নিবেদন নীতির যুগ বলা হয়, সেই সময়কাল টাকে জাতীয়তাবাদের চিন্তা, নেশন নামক দ্যোতনা ভারতের বুকে তৈরি ই হয় নি বলা যেতে পারে।কংগ্রেসের প্রথম যুগের আবেদন – নিবেদন নীতির ব্যর্থতা, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, এসব ঘিরে ধীরে ধীরে চরমপন্থী রাজনীতির বিকাশ, হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চিন্তার জঠর থেকে ক্রমশঃ জাতীয়তার ধারণাটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চিন্তার পরিপূরক হিশেবে বিকশিত হতে শুরু করেছিল।
                    বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠে( প্রথম প্রকাশ ১৮৮২।১৮৭৫ সালে ‘ বঙ্গদর্শনে’ একটা পাতার ফাঁকা জায়গা ভরতে  ‘ বন্দেমাতরম’ প্রথম  ব্যবহার করা  হয়েছিল।পরে বঙ্কিম ‘ আনন্দমঠ’ প্রকাশ কালে সেটিকে মূল গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।১৮৯৬ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সুরারোপ করে এটিকে প্রথম জনসমক্ষে পরিবেশন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ) যে ‘ ভবাণী মন্দির’ কে ঘিরে মাতৃবোধক দ্যোতনা উচ্চারিত হয়েছিল , সেটি ই একটি পূর্ণতা পেয়েছিল খানিকটা হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চেতনার জারকে চরমপন্থী নেতাদের হাত ধরে।
                    বাংলাতে তথা ভারতে চরমপন্থী রাজনীতির অন্যতম অগ্রদূত বিপিনচন্দ্র পাল লিখছেন; আমাদের  ইতিহাস হলো মায়ের ই পবিত্র জীবনালেখ্য।আমাদের দর্শনবোধের ভিতরে মূর্ত হয়েছে আমাদের মায়েদের মনের ই দৈবী বোধগুলি( পাঠক লক্ষ্য করবেন, এই পর্যায়ে প্রায় কোনো সামাজিক ব্যক্তিত্ব ই ভারতবর্ষ বা গোটা দেশের চেতনাকে উপস্থাপিত করছেন না।বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের চেতনায় প্রোজ্জ্বল থাকছে বাংলার প্রেক্ষিত।আবার মহারাষ্ট্রের চিন্তকদের প্রেক্ষিতে সুপ্ত থাকছে মারাঠি প্রেক্ষিত।পরিপূর্ণ ভাবে ‘ ভারতীয়’ প্রেক্ষিত কিন্তু আমাদের দেশে প্রথম উপস্থাপিত করেন রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দ।১৮৬৭ র ‘ হিন্দুমেলা’ আগে ‘ ভারতবর্ষ’ শব্দটির ও সেভাবে ব্যবহার দেখা যায় না) ।
                আমাদের শিল্প সৌষ্ঠব, কাব্য,চিত্রকলা,সঙ্গীত, নাট্যশাস্ত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্য — সব ই আমাদের মায়ের মনের নানা আঙ্গিকের বহিঃস্ফুরণ।মায়ের অভিজ্ঞতার ই পরিপূর্ণ প্রকাশ।বাইরের মানুষের কাছে আমার মায়ের পরিচিতি ‘ ইন্ডিয়া’ হিশেবে।আমাদের কাছে মায়ের আত্মার সুনিবিষ্ট সন্মিলনের ভিতরেই আমাদের ধর্ম লুকিয়ে আছে।… এই ভাবরূপের সন্মিলন ই আমাদের মাতৃসাধক করে তুলেছে( The Soul of India:A Constructive Study of Indian Thoughts and Ideals–Bipin ch paul[ Yugayatri Prakashak,Calcutta,1954]page-134)।
                          চরমপন্থী নেতারা, বিশেষ করে,বিপিন পালের মতো নেতারা বাংলাতে মাতৃভূমি, দেশমাতা ইত্যাদির দ্যোতনাকে উপস্থাপিত করলেন, ক্রমে তা বাংলাকে অতিক্রম করে আধুনিক ইউরোপীয় শিক্ষা, সংস্কৃতির ধারায় অভ্যস্থ আপামর দেশবাসীর কাছে মাতৃভূমি হিশেবেই বিকশিত হলো।এই মাতৃভূমির ধারণা উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে বিশ শতকের সূচনা পর্বে যখন প্রথম বিকাশ লাভ করতে শুরু করেছিল, তখন সেই ধারণাতে কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কেবলমাত্র একটি ভাব বা অবিকল্প মূর্তি হিশেবে প্রকটিত হয় নি।একটা সম্পুর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়েই এই বোধটি বিকশিত হয়েছিল।মা তাঁর সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন।স্তন্যদিয়ে অতি শৈশবে সন্তানের জীবন বাঁচিয়েছেন।জন্মদাত্রী মা আর লালনকর্ত্রী ভূমিকে একাত্ম করে স্বদেশচেতনা, সেই চেতনার জঠরেই মাতৃভূমির কল্পনা, জাতীয়তার প্রতিকল্প জাতীয় আন্দোলনের প্রথমলগ্নে আমাদের দেশে গড়ে উঠেছিল।জীবনদাত্রী তথা গর্ভধারিণীর অবদান আর অন্ন, আশ্রয়দাত্রীর অবদানকে একাত্ম করেই প্রথম পর্যায়ে বিদেশি শাসক ব্রিটিশের প্রতি ঘৃণার জঠরে আমাদের ছাতীয়তার প্রাথমিক বোধের জন্ম।
                      এই বোধে সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো মাতৃতান্ত্রিকতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।ইউরোপ যে পিতৃতান্ত্রিকতা কে প্রধান উপজীব্য করে, সেই রূপকধর্মীতার সঙ্গে আমাদের দেশের মাতৃপ্রাধান্যবোধক চেতনা সজ্ঞাত জাতীয়তার ধারণা একদম ভিন্ন প্রকৃতির।বিপিন পাল এই দ্যোতনাকেই  টিকেই ; গোটা বিশ্বকে প্রকৃতি বলে বোধে উপস্থাপিত করার বোধ হিশেবে দেখিয়েছিলেন(Soul of India–Bipin ch paul ,page-102-109)।এই মাতৃতান্ত্রিক বোধ সজ্ঞাত ‘ জাতীয়তা’ র ধারণাকে রাজনৈতিক হিন্দুরা প্রতিষ্ঠিত করে লিঙ্গ বৈষম্যের চরম পরাকাষ্ঠা ‘ মনুসংহিতা’ র পুরুষতান্ত্রিক , ভয়াবহ লিঙ্গবৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে।
                      তাই এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবেই বলতে হয় যে, জাতীয় আন্দোলনের সূচনা পর্ব থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাল পর্যন্ত, একটা বিস্তীর্ণ সময় জুড়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং সশস্ত্র বিপ্লববাদী চেতনা, যে দুটি চেতনার ই মূল সুর ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের তাড়ানো, সেই চেতনার ভিতরে কখনো কোনো পুরুষতান্ত্রিকতার বিন্দুমাত্র ঝোঁক ছিল না।
             সেই জন্যে ই এই দিক থেকে বিচার করে আমাদের স্থির সিদ্ধান্তে আসতেই হয় যে, জাতীয় আন্দোলনকালের জাতীয়তাবোধ আর এখন হিন্দুত্ববাদী শক্তি আর এস এস বা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি যে ‘ রাষ্ট্রবাদে’ র কথা বলছে– তা কখনোই এক নয়।ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদ, নানা সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বে ও সঙ্ঘ- বিজেপির ‘ রাষ্ট্রবাদে’ র থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন, আলাদা একটি দূষ্টিভঙ্গি, চেতনা , বোধ এবং অভিব্যক্তি।জাতীয়তাবাদের পরিপূরক কখনো রাষ্ট্রবাদ নয় এবং হিন্দুত্ববাদীরা যে জাতীয়তাবাদ বা তার প্রতিশব্দ হিশেবে ‘ রাষ্ট্রবাদ’ শব্দটিকে এখন সামাজিক ভাবে গ্রহণযোখ্য করে তুলতে চাইচে, সেটি স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম মূলভাবনার কোনো অবস্থাতেই সমার্থক কোনো ভাবনা নয়।দুটি একদম পৃথক ধারণা।স্বাধীনতাকালের জাতীয়তার ধারণা অখন্ড ভারতের বহুত্ববাদী, সমন্বয়ী চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার ভাবনা।আর ‘ রাষ্ট্রবাদ’ বা হিন্দুত্ববাদীরা যে জাতীয়তার কথা বলে , সেটা বহুত্ববাদী , সমন্বয়ী চেতনা সঞ্জাত ভারতকে টুকরো টুকরো করার ভাবনা।
                      পরিবেশ বিজ্ঞানকে ঘিরে আধুনিক বিশ্ব নিত্য নোতুন গবেষণা চলছে।এই গবেষণার প্রাথমিক ভিত্তিতে বিশ্বকে পরিমিত করা হচ্ছে মানবসমাজের গর্ভধারিণী হিশেবে।বিশ্বকে মাতৃঞ্জানে উপলব্ধিতে এনে তাঁকে রক্ষা করার এই বোধ টি কিন্তু প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের অবদান, সেই বোধটিকেই জাতীয় আন্দোলনের সূচনাকালে প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছিল।এই বোধটি কিন্তু প্রাচীন বিশ্ব ভারত থেকে আহরণ করলেও ষোড়শ, সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানচর্চায় এ বোধ বিঘ্নিত হয়েছিল।আধুনিক পরিবেশ বিদ্যাচর্চার দৌলতে অতি প্রাচীন সেই চেতনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে।এই সমীকরণ থেকেই আধুনিক পরিবেশ বিদেরা বলছেন; পরশুরাম ছাড়া পুরুষেরা কিন্তু তখন হরবখত মাতৃহত্যায় হাত রাঙাতো না।মায়ের নাড়িভুঁড়ি ঢুড়ে সোনার তাল তুলে আনতো না( The Death of Nature : Women ,Ecology and the Scientific Revolution –Merchant Caroly.1980.page– 2-3)।
                              প্রাচীন ভারত ও মধ্যকালীন ভারতের এই মাতৃতান্ত্রিক চেতনার জঠরে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনার জাগরণে আমাদের দেশে যে জাতীয়তাবোধের  বিকাশ লাভ করেছিল,এই চেতনার বিকাশে মধ্যকালীন ভারতের ভক্তি আন্দোলনের ও একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদান আছে।আধুনিক বিশ্বে এটি মধ্যকালীন ভারতের অতি বিশিষ্ট্য একটি অবদান।
                     আধুনিক বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞান যেখানকার থেকে বিপুলা পৃথিবীর মাতৃমূর্তির ছবি এঁকেছে, সেই বোধের সঙ্গে লিঙ্গ বৈষম্যবাদের চরম সমর্থক, পুরুষতান্ত্রিক মনুবাদী বিভাজনে বিশ্বাসী হিন্দুত্ববাদীদের বিকৃত জাতীয়তা ‘ রাষ্ট্রবাদে’ র এতোটুকু মিল নেই।
                          বিপিনচন্দ্র পাল ‘ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’ র একটি দ্যোতনা উপস্থাপিত করেছিলেন। সেই চেতনার স্ফুরণে বিপিনচন্দ্র দেশমাতৃকা আর প্রকৃতিমাতৃকার একটা একীভূতকরণ করেছিলেন।এই একাঙ্গীকরণে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ ‘ বিশ্লেষণী কুটকৌশল’ দেখতে পেলেও , সেই কৌশলে কিন্তু পরমত, পরধর্মের প্রতি বিন্দুমাত্র অসূয়া, বিদ্বেষ, রাগ, শ্লেষ ,অপমান, অসম্মান, অমর্যাদা প্রকাশ করা হয় নি।এই বিশেষণগুলির প্রতিটিই কিন্তু পরবর্তী সময়ে হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক বোধের প্রধান উপস্থাপক গোলওয়ালকর কর্তৃক উদ্ভূত ” সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’ র তত্ত্বের ভিতরে দগদগে ঘায়ের মতো ছিল।
                     গোলওয়ালকার ‘ হিন্দু, হিন্দু, হিন্দুত্ব’ এর নামে যে ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ এর ধারণা দিয়েছিলেন , তার ভিতরে লুকিয়ে আছে বহুত্ববাদী ভারতের প্রতি চরম চ্যালেঞ্জ।মূল লক্ষ্য ছিলেন দেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়।গোলওয়াল চেয়েছিলেন, তাঁর প্রবর্তিত তথাকথিত ‘ জাতীয়তাবাদে’ মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার নামে তাঁদের কার্যত নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে।আর জাতীয় আন্দোলনের সময় কালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করার ভাবনা থেকে যে ‘ জাতীয়তাবাদে’ র উৎপত্তি, সেখানে জাতি- ধর্ম- বর্ণ- ভাষা নির্বিশেষে এদেশের মানুষদের ভিতর সার্বিক ঐক্যের লক্ষ্যে ব্রতী হওয়ার আহ্বান ই জানানো হয়েছে।
                     এখানে একটা কথা কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, একাংশের মানুষ আছেন ,যাঁরা প্রাচীন ভারতে নারী সাম্যের দ্যোতনাবাহী মাতৃপুজোর ধারার ভিতরে এক ধরণের নারী বিদ্বেষ খুঁজে পান।যে ধারাতে কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনকালে দেশকে মাতৃজ্ঞানে ভালোবাসা বোধের ভিতর দিয়ে উদ্ভূত বিদেশি শাসক বিরোধী ‘ জাতীয়তা’ বোধের উদ্ভব আমাদের দেশে হয় নি।পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক স্তরে অত্যাধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও পৃথিবীকে ‘ মা’ বলে মনে করার ভিতর দিয়ে নারী এবং সন্তান উৎপাদনকে একাত্ম করে দেখার কোনো ভাবনা গড়ে ওঠে নি।
                         জাতীয়তাবাদকে যাঁরা রাষ্ট্রবাদ হিশেবে দেখেন, সেই রাজনৈতিক হিন্দুরা ‘ ভারতমাতা’ কে তাঁদের রাজনৈতিক বোধের শরিক করলেও ,নারীকে কোনো অবস্থাতেই পুরুষতান্ত্রিকতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না।ইতিহাসবিদেরা কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম লগ্নে , জাতীয়তার উন্মেষকালে নারীর প্রতি সদ্য জাগরিত দেশপ্রেমের সম্ভ্রমকে অত্যন্ত মর্যাদার দৃষ্টিতেই দেখেছেন।ইতিহাসবিজ্ঞানীদের লিঙ্গ বিভাজনে আখ্যায়িত করা একটি অবৈজ্ঞানিক চিন্তা হলেও কেবল তথ্যগত কারনেই এটা উল্লেখ করতে হচ্ছে যে, ব্রিটিশের শাসন তথা শোষণে এদেশের নারীর অবস্থান যে চিরকালীন নারীর যন্ত্রণাময় জীবন, যাঁদের সামাজিক উৎবৃত্ত( সারপ্লাস ভ্যালু) কে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন কার্ল মার্কস, সেই নারীর বিপরীত ,রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,’ এক হাতে তোর কৃপাণ আছে, আর এক হাতে হার’ হিশেবে জাতীয়তাবাদী চিত্রমালাতে অঙ্কিত করা হয়েছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তিনি নিজে ও একজন নারী।অবনীন্দ্রনাথের ‘ ভারতমাতা’ কে অধ্যাপিকা তনিকা সরকারের কাছে মনে হয়েছে; অশ্রভরা বেদনা( Nationalist Iconogrpahy– Tanika sarkar, page– 2013)।
                           সাধারণ মানুষের কাছে তাই তথ্য, যুক্তি, বিশ্লেষণের ভিতর দিয়ে বোঝাতে হবে, বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উপর প্রবাহমান ভারতের সমন্বয়ী চেতনার ধারাতে ব্রিটিশকে এই দেশ থেকে তাড়াতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কাছে যে ‘ জাতীয়তাবাদে’ র উদ্ভব ঘটেছিল, পরবর্তী সময়ে যে চেতনা ভারত কে সমৃদ্ধি র পথে এগিয়ে দিয়েছে, সেই চেতনাকেই এখন দেশবিরোধী, দেশদ্রোহী ভাবনা হিশেবে তুলে ধরতে চায় দেশের শাসক শক্তি।ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উপর সৃষ্টি হওয়া জাতীয়তাবোধের বিপরীত ধারণা, এ দেশের প্রবাহমান বহুত্ববাদী, সমন্বয়ী সাংস্কৃতিক চেতনার বিপরীত , এককেন্দ্রিক, ফ্যাসিবাদের নামান্তর বোধ কেই ভারতের চেতনা হিশেবে রাজনৈতিক হিন্দুরা ‘ রাষ্ট্রবাদে’র নাম করে চাপিয়ে দিতে চায়।যেকোনো মূল্যে এই চক্রান্ত আমাদের প্রতিহত করতেই হবে।তা না হলে আগামী দিনে আমাদের দেশ বাঁচবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *