গ্রাম চর্চা

গ্রামচর্চা: সমাজ
ধর্মমঙ্গল কাব্যে আছে ইছাই ঘোষ কর্ণসেনের পুত্র লাউসেনের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এই নিবন্ধের সঙ্গে প্রদত্ত ছবিতে যে বিশাল শিবমন্দির দেখা যাচ্ছে স্থানীয় ভাষায় তার নাম ইছাই ঘোষের ‘দেউল’, তার পাশেই অজয় নদের তীরে নাকি এই যুদ্ধ হয়েছিল বলে সেখানকার সাধারণ অধিবাসীরা বলেন। কর্ণসেন ছিলেন মেদিনীপুরের কোনো এক অঞ্চলের সামন্ত রাজা। তাঁর সেনাপতি ছিলেন ডোম জাতি সম্ভূত কালুবীর। এই কালুও সেই যুদ্ধে নিহত হন। ইছাই ঘোষের দেউল অজয় নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। অজয়ের উত্তর তীরে ‘লাউসেনতলা’ নামে এক গ্রাম আছে। স্থানীয় প্রবাদ লাউসেন এই গ্রামেই তাঁর সৈন্য শিবির স্থাপন করেছিলেন। এখনো ডোম জাতির মানুষেরা বহু দূর দূর অঞ্চল থেকে প্রতি বছর ১৩ই বৈশাখ তারিখে এসে তাঁদের স্বজাতি কালুবীরের পুজো করেন। ইছাই ঘোষ তথা ঈশ্বর ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল সেই জায়গা অজয়ের দক্ষিণ তীরে, যার বর্তমান নাম ‘কাঁদুনে ডাঙা
ইছাই ঘোষ শক্তির উপাসক ছিলেন। ঢেক্কুর ছিল বৌদ্ধতান্ত্রিক পীঠস্থান। পালযুগের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অথচ এই সামন্ত রাজা ইছাই ঘোষ ছিলেন হিন্দু তন্ত্রবাদী। হয়তো তিনি তান্ত্রিক সাধকও ছিলেন। এবং ধর্মভিত্তিক তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় হয়তো এই কারনেই নিজের সামন্তরাজকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন। দুর্গাপুরের পাশেই অজয় নদের দক্ষিণ তীরে গড়জঙ্গল, যা একদিকে দলমা পাহাড় অন্যদিকে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। গড় জঙ্গল নামকরনের কারন সেখানে বহু যুগ আগে দুর্গ ছিল। অনুমান সেই দুর্গ ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষের নির্মিত। স্থানীয় মানুষেরা একে বলেন ইছাই ঘোষের গড় বা শ্যামারূপার গড়। শ্যামারূপা দুর্গার আরেক রূপ, ইছাই ঘোষ ছিলেন তাঁর উপাসক। শ্যামারূপার গড়ের ভগ্নাবশেষ আজও সেই জঙ্গলের মধ্যে দেখা যায়। সেখানে আজও আছে শ্যামারূপার মন্দির, যেখানে বিপুল ধুমধাম করে এখনো দুর্গাপুজো হয়। মন্দিরের আসল মূর্তি চুরি হয়ে গেছে। বর্তমান মূর্তি কোনো এক সাধক বেনারস থেকে এনেছিলেন বলে জনশ্রুতি। এর কাছেই পোড়ামাটির ইঁট নির্মিত বিশাল রেখ দেউলটি আসলে শিব মন্দির। সেখানে সেই প্রাচীন যুগের বিশাল শিবলিঙ্গ আজও দেখা যায়। এই মন্দিরই ইছাই ঘোষের দেউল নামে পরিচিত। মন্দির স্থাপত্যে এই ইছাই ঘোষের দেউল বা তার নিকটবর্তী রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির নির্মাণে দক্ষিণী স্থাপত্য ছাপ স্পষ্ট। সম্ভবতঃ রাজেন্দ্র চোলের বঙ্গ বিজয়ের প্রভাব বহন করে চলেছে এইসব প্রাচীন স্থাপত্য। এই দেউল নির্মাণ নিয়েও দ্বিমত আছে। একদল ঐতিহাসিক মনে করেন এটি ঈশ্বর ঘোষ তথা ইছাই ঘোষই নির্মাণ করেছিলেন, অন্যদল অনুমান করেন গোপভূমের সদগোপ রাজারা ইছাই ঘোষের নামটি স্মরণীয় করে রাখার জন্যি পরবর্তী কালে এই দেউল নির্মাণ করেন। তাঁদের অনুমান এটি পঞ্চদশ শতকের পরেই নির্মিত হয়েছিল।
ইছাই ঘোষ তথা ঈশ্বর ঘোষের কাল, শাসন, বিস্তৃতি বিষয়ে সুনির্দিষ
অষ্টমীর সন্ধ্যায় তোপের আওয়াজ আর সেই আওয়াজ শোনার পরেই শুরু হয় কাঁকসার ও বীরভূমের কয়েকটি গ্রামের বলি। তবে সেই আওয়াজ কোথা থেকে যে আসে তা কেউ জানে না, তাই তোপের আওয়াজ শুনতে আজও কাঁকসার গড়জঙ্গলের শ্যামরুপা মন্দিরের পূজো দেখতে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ।
কাঁকসার মলানদীঘি থেকে বনকাটি অবধি ঘন জঙ্গল আর সেই জঙ্গলেই রয়েছে শ্যামরূপা মন্দির ।
কথিত আছে ওই জঙ্গলে এক সময় ছিলো কাপালিকদের বাস। তারা রীতিমতো পূজো করতে দিতেন নর বলি। তবে এখানে ছিলো না কোনো দেবীর প্রতিষ্ঠিত মন্দির বা মূর্তি। লক্ষণ সেন যুদ্ধ্যে পরাজিত হলে গা ঢাকা দেন সৈন্যদের নিয়ে এই গড় জঙ্গলেই। সেখানে কাপালিকদের পরামর্শ মতো পূজো শুরু করেন আর সেই পুজোতে নর বলি দেবার আয়োজন করা হলে সেখানে ছল করে উপস্থিত হন সভা কবি কবি ঘোষ। এর পরেই সকলের সামনে তিনি কৃষ্ণ ও দুর্গার দর্শন দেন। সেই থেকে বন্ধ হয় নর বলি।
আর সেই থেকেই শুরু হয় শ্যামরূপার পূজো। মহা ধুমধামের সাথে সেই পূজো আজও হয়ে আসছে । শোনা যায় লক্ষণ সেন গড় জঙ্গল ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ইছাই ঘোষ কে পুজোর ভার দিয়ে যান। ইছাই ঘোষ ছিলেন দেউলের সামন্ত রাজা সোম ঘোষের পুত্র।
কোনো একবছর দুর্গা পূজার সময় ইছাই ঘোষ কে দেবী স্বপ্নাদেশ দেন যে, সপ্তমীতে যুদ্ধে না গিয়ে অষ্টমীতে যেতে কিন্তু দেবীর কথা অমান্য করেই তিনি সপ্তমীতেই যুদ্ধে গেলে পরাজিত হন, শুধু তাই নয় সেই যুদ্ধে তিনি নিহতও হন।
ইছাই ঘোষ নিহত হলে তার অনুচররা দেবী মূর্তিকে গড় জঙ্গলের সায়রে বিসর্জন দিয়ে দেয়। পরে সেখানে একটি অষ্টধাতুর মূর্তি স্থাপন করা হলে ইছাই ঘোষের পালিত কন্যা কল্যাণী নিজের শ্বশুরবাড়ী যাবার সময় সাথে করে ওই অষ্টধাতুর মূর্তি নিয়ে যান। আসানসোলের বরাকরের কাছে হঠাৎই পরে যায় সেই মূর্ত । তাই আর দেবী মূর্তি সেখান থেকে না নিয়ে ওখানেই প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বরাকরের সেই দেবীই আজ কল্যানেশ্বরী নামেই পরিচিত।
তবে গড় জঙ্গলে পরে একটি পাথরের মূর্তি বসিয়েই পূজো হয় আজও। তবে অষ্টমীর সন্ধি পুজোতে তোপের আওয়াজের পরেই পাঁঠা বলি শুরু হয় কাঁকসা ও বীরভূম জেলার প্রায় ২০টির বেশি গ্রামে। অষ্টমীর দিনে এখনো শ্বেত পাঁঠা বলি হয় এখানে। গোটা পুজোর অনুষ্ঠান হয় ভক্তদের অনুদানে । পুজোর ৪ দিন প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয় এই গড় জঙ্গলে।স্থানীয়রা বলেন তোপের আওয়াজ হলেও আজ তা ঠিক মতো বোঝা যায় না কারণ যেভাবে চারিদিকে বাজি ফাটে ও মাইকের আওয়াজ হয় তার কারণে তোপের আওয়াজ ঠিক করে বোঝা যায় না ।
তবুও অষ্টমীর সন্ধি পুজোর সময় তোপের আওয়াজ শোনার জন্য গড় জঙ্গলে কান পেতে থাকে অপেক্ষায় থাকে মানুষ
বনকাঁথি একটি অচেনা ছোট্ট গ্রাম, বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে অবস্থিত। ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে একটি নান্দনিক দর্শনীয় স্থান। ঘন জঙ্গল বেষ্টিত হাজার বৎসর পুরোনো একটি ইট নির্মিত টাওয়ার মন্দির দেউলপার্কে অবস্থিত। এই মন্দির ইছাই ঘোষের তৈরি। এখান থেকে দূরে দিগন্ত বিস্তৃত অজয় নদী প্রবাহিত। হাঁটু সমান জল। এই হাঁটু জলে জেলেরা মাছ ধরছে জাল দিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে। নদীর তীরে বালি তুলে গাড়ি করে নিয়ে যাচ্ছে। মন্দিরটি একটু উঁচু জায়গায়। সেখান থেকে অজয়ের তীরের দৃশ্য এক অনন্য অনুভূতি জাগায়।
কথিত আছে এই স্থান আগে ১০৩৮ খ্রিস্টাব্দে গোপভূমি নামে পরিচিত এবং আলাদা স্বাধীন রাজ্য হিসাবে ছিল পাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আগে। মহীপালের পুত্র নয়াপালের শাসনের সময় থেকে পাল সাম্রাজ্য ভাঙ্গতে শুরু করে। অনেক স্থানীয় শাসক নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করল শাসন থেকে। এমনই একজন ইছাই ঘোষ নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ইছাই ঘোষ তখন স্থানীয় রাজা কর্ণ সেনকে পরাজিত করেন, অধুনা বর্ধমানের বিভিন্ন জায়গা অধিকার করেন এবং নিজেকে স্বাধীন গোপভূমির রাজা হিসাবে ঘোষণা করেন। পরের বছর কর্ণসেনের পুত্র লাউসেন ইছাই ঘোষকে হত্যা করে অজয় নদীর তীরে কাদুনে ডাসা বলে পরিচিত এক স্থানে। ইছাই ঘোষের সময়ই দেউল অর্থাৎ টাওয়ার তৈরি হয়েছিল, যদিও কে তৈরি করেছিলেন, তার কোনো রেকর্ড নেই। কেউ বলেন রাজা চিত্রসেন তৈরি করেছিলেন। ১১ শতাব্দীর ইটনির্মিত এই ৫০ ফুট উঁচু দেউল ৯৭৪ বৎসরের পুরোনো। মন্দিরের ভিতরে শিবলিঙ্গ আছে। লম্বা ও শক্তপোক্ত এই মন্দিরে উড়িষ্যার রথশৈলীর মন্দির স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট।
এই মন্দির এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ দ্বারা সংরক্ষিত। এর সীমানা প্রাচীর দেওয়া আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। মন্দিরেরে গায়ে গাছপালা গজিয়েছে ও চারিদিকে গরুছাগল চড়ে বেড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *