শতবর্ষে হেমন্ত

আমাদের সমাজে নানা পরিসরে যাঁরা অবদান রেখে গেছেন ,তাঁদের জন্মশতবর্ষ পালন একটা সামাজিক রীতিতে পর্যবসিত হয়েছে ।রাজনীতিবিদ ,সমাজকর্মী, শিক্ষাব্রতী ,কবি ,শিল্পী ,সাহিত্যিক, গায়ক, নায়ক –সবারই শতবর্ষ পালনের ভেতর দিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষটির সামাজিক ভূমিকা কে আমরা স্মরণ করি। তাঁর রেখে যাওয়া সামাজিক অবদান কে আমরা আবারও স্মরণ করার ভিতর দিয়ে তাঁর দেখিয়ে যাওয়া পথ কে, আগামী দিনের পথ চলার ক্ষেত্রে আমরা আরও প্রাসঙ্গিক করে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি ।
                       এই পরিপ্রেক্ষিতেই কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষের প্রাক মুহূর্ত টি আমাদের বাঙালি সমাজের কাছে একটি বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে এসেছে। স্বর্ণ কন্ঠের অধিকারী ছিলেন হেমন্ত। অসামান্য সুরকার ছিলেন ।সমসাময়িক শিল্পী ,সুরকার দের প্রতি দায়িত্ববোধের যে পরাকাষ্ঠা তিনি তাঁর সংগীত জীবনে রেখে গেছেন, তা তাঁর মৃত্যুর এতদিন পরেও সহকর্মী, সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি আদর্শ মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়।
                       এটাই কি সব ?এটাই কি কেবল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্ম শতবর্ষে তাঁকে ঘিরে আমাদের ভালোবাসা ,শ্রদ্ধার একমাত্র উপজীব্য? সুধা কন্ঠের অধিকারী তো বহু শিল্পীই হন, কিন্তু ক’জন হেমন্তের মত সমাজমনস্ক হন? কজন হেমন্তের মতো পারিপার্শ্বিকতার প্রতি দায়বদ্ধ হন? কজন হেমন্তের  মতো অগ্রজের  প্রতি শ্রদ্ধাবান আর অনুজের প্রতি পরম স্নেহময় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ,সেই অনুজের পেশাজীবন টি গড়ে তোলবার ক্ষেত্রে  অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন ?
                     বস্তুত বাংলা বিনোদন জগতে সরাসরি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে না এসে  প্রগতিশীল ,ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে একটা ক্রান্তিকারী ভূমিকা রেখে ,শিল্পী জীবনের যাবতীয় গ্লামার কে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে ,গভীর সমাজমনস্কতার যে  পরিচয়  সামান্য কয়েকজন  রেখেছিলেন তারা হলেন কানন দেবী ,সুচিত্রা মিত্র এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।  বিনোদন জগতে উৎপল দত্ত ,শোভা সেন ,অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কালজয়ী  শিল্পী রা যে গভীর দায়িত্ববোধ, সমাজমনস্কতার পরিচয় রেখেছিলেন ,তার পিছনে কাজ করেছিল তাঁদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংযোগ, বোধ, বিশ্বাস এবং মননশীলতা ।
                          প্রত্যক্ষভাবে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছ থেকে যে দায়বদ্ধতা সমাজ আশা করে, সেই দায়বদ্ধতা উৎপল দত্ত প্রমুখেরা ,সুচিত্রা মিত্র চিরজীবন প্রকাশ্যে তাঁর রাজনৈতিক আস্থা বুক বাজিয়ে বলে গেছেন, কিন্তু কানন দেবী বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দুটি প্রজন্মের দুটি ব্যক্তিত্ব, কানন দেবী, যিনি সরাসরি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রায় আসেন ই নি বলা যায়, অপরজন হেমন্ত ,তাঁর স্কুল জীবনের বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহচর্যে, নিজের শিল্পী জীবনকে বিকশিত করবার প্রথম লগ্ন থেকেই মানুষের দুঃখ ,মানুষের যন্ত্রণা, মানুষের কান্না কে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করেছিলেন।
                            পরবর্তী সময়ে হেমন্তের এই সমাজ মনস্কতার দিকটি, যেদিক  নিয়ে হেমন্ত তাঁর মাত্র ৬৯ বছরের জীবনে কখনো প্রচার মাধ্যমের সামনে কোন রকম ভাবেই ঢোল করতাল নিয়ে বসেন নি ,সেই দিকটির বিকাশে তাঁর বন্ধু সলিল চৌধুরীর একটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল । এই পর্বে ই গণনাট্য আন্দোলনের একদম প্রথম যুগের সৈনিক কলিম শরাফীর ভূমিকা হেমন্তের জীবনে কম নয়। শিল্পী হেমন্তের কন্ঠ মাধুর্যে আমরা মুগ্ধ মুগ্ধ। তাঁর সুরের জাদুর পরশে আমরা মোহিত ,অথচ আমরা কজন জানি, সেই হেমন্ত নিছক অর্থ উপার্জনের তাগিদে কিন্তু সুকান্তের ‘অবাক পৃথিবী’, বা’ গাঁয়ের বঁধু ‘,’রাণার’ কিংবা সত্যেন্দ্রনাথের ‘পালকির গান ‘গাননি ।
                     সলিলের  অনবদ্য সুরের পরশে এই গানগুলির ভেতর  দিয়ে এই গানগুলি র স্পর্শে তিনি সেই সময়ের মানুষের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যন্ত্রণাকে সংহত করে একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক গণসংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবার সড়ক নির্মাণ করেছিলেন।
                    বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় হেমন্তের সঙ্গে মানুষের লড়াই -সংগ্রামের যে সেতুবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তাঁদের স্কুল জীবনে, সেই মানুষের কাছ থেকে কিন্তু একদিনের জন্য হেমন্ত দূরে সরে যাননি। পেশার তাগিদে বিনোদন জগতের নানা পর্যায়ে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।  বাংলার গণ্ডি কে অতিক্রম করে মুম্বাইয়ের ফিল্মি দুনিয়া কে মুগ্ধতার আবেশ ও ভরিয়ে রেখেছিলেন ।সেই আবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে কিন্তু ছিল’ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি ‘র কান্না ।সেই কান্না কে ক্রোধে  পর্যবসিত করে, শিল্পের ভেতর দিয়ে মানুষের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরিতে হেমন্তের ছিল অনন্য সাধারণ ভূমিকা।
                          গণনাট্য আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভেতর দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি বাঁধা ধরার নিয়ম নীতির ভেতরে না থেকেও তাঁকে এই পরিমন্ডলের  ভেতরে আনতে সব থেকে বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন কবি সুভাষ ,সলিল চৌধুরী ,কলিম শরাফী এবং অবশ্যই হেমন্তের চিরজীবনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য বন্ধু সুচিত্রা মিত্র ।চার,পাঁচের  দশকে যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা ,দেশভাগ বিধ্বস্ত বাংলায় হেমন্তের কন্ঠে’ বিদ্রোহ চারিদিকে বিদ্রোহ আজ’ যেন তাঁকে বাঙালি পল রবসনে  ভূমিকায় উৎকীর্ণ করে দিয়েছিল।
                            এই সময় কালে গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সাহচর্য, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ,দেবব্রত বিশ্বাস যাকে হেমন্ত চিরকাল’ কাকা’ বলে ডাকতেন, কলিম ,শরাফী,সুচিত্রা মিত্র, সুরপতি নন্দী ভূপতি নন্দী ,রেবা রায়চৌধুরী প্রমুখ,বাংলার বাইরে প্রেম ধাওয়ান, কাইফি আজমি প্রমুখের সঙ্গে সংযোগ এবং একসঙ্গে কাজ করার ভেতর দিয়ে যে সমাজ সচেতনতা, সমাজ মনস্কতা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছিলেন, তেমনটা তাঁর সমসাময়িক কালে কিংবা পরবর্তীকালে  গ্ল্যামারের শীর্ষে থাকা একজন শিল্পী ও কিন্তু দেখান নি। এখানেই নিহিত রয়েছে স্বর্ণ কণ্ঠের হেমন্ত, জাদুকরী সুরের স্রষ্টা হেমন্ত কে অতিক্রম করে’ মানুষের হেমন্তে’র জন্ম শতবর্ষ পালনের প্রকৃত তাৎপর্য।
                                    হেমন্তের জীবৎকালে বা তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অসংখ্য আলোচনা হয়েছে ।তাঁর গাঁয়ের বধু, রানার পালকির গান ইত্যাদি গানগুলির  প্রেক্ষাপট নিয়ম অনেকেই অনেকে আলোচনা করেছেন। সলিল চৌধুরী এই গানগুলি সুর  দরবার অনেক আগে ,হেমন্ত সেগুলি রেকর্ড করবার অনেক ই আগে, অকাল প্রয়াত  বন্ধু কবি সুকান্তের সৃষ্টিকে কিভাবে গানের ভেতর দিয়ে মানুষের দরবারে হাজির করা যায়  সেই গানের ভেতর দিয়ে মানুষকে কি করে সমাজ সচেতন করে তোলা যায়, সমাজমনস্ক করে তোলা যায় ,সর্বোপরি সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে  অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় –তা নিয়ে বন্ধু হেমন্তের সঙ্গে বহুবার বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করেছিলেন কলিম শরাফী ।
                          কোন কোন ক্ষেত্রে এসব আলোচনা সাক্ষী থেকেছিলেন সমরেশ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীকালে হেমন্তের সহকারি হিসেবে কাজ করতেন। কবি সুভাষ, শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় ,কলিম শরাফী -এঁরা তখন তাঁদের অকাল প্রয়াত  বন্ধু ,কবি সুকান্তের সৃষ্টি কে মানুষের দরবারে আরো জোরালো ভাবে তুলে ধরবার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন ।সুকান্তের কবিতা কে নিয়ে কিছু করা যায় কিনা এইসব আলাপ-আলোচনা গুলিতে হেমন্তের সঙ্গে কবি সুভাষ কলিম শরাফি, ,শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় প্রমুখের ওই গানগুলি রেকর্ডিং হওয়ার অনেক আগেই বহুবার আলাপ-আলোচনা হয়েছিল ।তাই একথা অত্যন্ত জোরে সঙ্গে বলতে হয় যে ,নিছক রেকর্ড করার তাগিদে, কেবলমাত্র জনপ্রিয়তা অর্জনের তাগিদে, খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছবার লক্ষ্যে, সর্বোপরি অর্থ উপার্জনের জন্যে হেমন্ত এই কালজয়ী গান গুলি কে রেকর্ড করেন নি ।
                             একটা গভীর সমাজ মনষ্কতা ,সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা, প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসা ,সর্বোপরি মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ওই সব কালজয়ী কবিতা গুলি কে সলিলের কালজয়ী সুরের ভেতর দিয়ে কালের কষ্টি পাথরে খোদিত করে গেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। 
                       সমসাময়িক অনেক  পেশাদার শিল্পী সলিল চৌধুরীর সুরে বা অন্যান্য প্রগতিশীল সুরকারদের সুরে প্রগতির কথা বলা অনেক গান গেয়েছেন ।কিন্তু সেই সব শিল্পীদের ভেতর কতখানি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো সামাজিক দায়বদ্ধতা কাজ করেছিল তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে ।একটা সময়  গণনাট্যের  পরিমণ্ডলে থেকেছেন বলে পরবর্তীকালে সেটিকে ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের  মতো কিন্তু কোনদিন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ব্যবহার করেননি ।
                        তাঁর ব্যক্তি জীবনে বামপন্থী চিন্তা চেতনার প্রতি একটা প্রবল পক্ষপাতিত্ব ছিল ।আবার সেই পক্ষপাতিত্বের কারণে সেই সময়ের সরকার বাহাদুর বা  পন্ডিত নেহরু তাঁকে যখন কোন সামাজিক দায়বদ্ধ তা সূচক কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই সব দায়িত্ব কিন্তু হেমন্ত একবারের জন্য এড়িয়ে যান নি ।ব্যক্তিগত আলোচনা স্তরে তিনি বারবার বলতেন ;গণনাট্য আন্দোলনের প্রেক্ষিত, বামপন্থী ভাবধারার প্রেক্ষিত থেকে সংগীত জগতে তাঁর খ্যাতির শীর্ষে উপনীত হওয়ার সমস্ত খবর জানা স্বত্ত্বেও তাঁর ই প্রযোজিত’ নীল আকাশের নীচে’  ছবি প্রিমিয়ার দেখতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত নেহরু নিজ কন্যা  ইন্দিরা কে নিয়ে উপস্থিত হতে দ্বিধা করেননি।
                             এই মানবিক মূল্যবোধের দিকটিকে শিল্পী হেমন্ত সব সময় গভীর মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করে গেছেন ।আর সেই কারণেই তাঁর সঙ্গে সুচিত্রা মিত্রের বন্ধুত্বের জায়গাটি এত মজবুত। অনেকেরই হয়তো জানা নেই ,সুচিত্রার ব্যক্তি জীবনের চরম বিপর্যয় দিনগুলিতে নীরবে-নিভৃতে তাঁকে সব থেকে বেশি সাহায্য করেছিলেন তাঁর  বন্ধু হেমন্ত ।অথচ কানন দেবীর মতোই এই সাহায্য -সহযোগিতার বিষয়টি কে হেমন্ত চিরদিন  অত্যন্ত সযত্নে সচেতনভাবে পর্দার আড়ালে রেখে গেছেন।
                               এই মূল্যবোধের প্রশ্নেই উত্তম কুমারের শেষ জীবনের বেশ কয়েক বছর হেমন্তের সঙ্গে  উত্তমের  যথেষ্ট মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই সময়কালেও কিন্তু হেমন্ত একটি দিনের জন্যও তাঁর রাজনৈতিক মূল্যবোধ থেকে এক বিন্দু সরে আসেননি ।হেমন্ত প্রোপাগান্ডিস্ট ছিলেন না। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে সেভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলের বাইরে বুঝতেও দিতেন না। মিটিং মিছিলে তাঁকে প্রায় হাঁটতেই দেখা যায়নি বলা যেতে পারে, অথচ শিল্পীর অধিকার ,বিশেষ করে মহিলা শিল্পীদের আর্থিক -সামাজিক নিরাপত্তা ,সর্বোপরি তাঁদের ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় যেভাবে সচেষ্ট থেকে গেছেন তার নজির বাংলা বিনোদন জগতে প্রায় নেই বললেই চলে।
                     ব্যক্তি জীবনের স্বচ্ছতা, সততা, নিরপেক্ষতা এবং  আদর্শবোধ একজন মানুষকে কিভাবে যথার্থ সমাজমনস্ক করে তোলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ।এ প্রসঙ্গে তাঁর ব্যক্তি জীবনের দুটি ঘটনার উল্লেখ করে এই নিবন্ধের ইতি টানব ।’অতল জলের আহ্বান’  ছবির গান রেকর্ডিং চলছে। রেকর্ডিং করছেন সুজাতা চক্রবর্তী। সেই বিখ্যাত গান,”  ভুল সবই ভুল।” কিন্তু সুজাতার সেই ‘ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলা ‘হেমন্তের কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না ।বিরক্ত হেমন্ত রেকর্ডিং স্টুডিও ছেড়ে চলে গেলেন কেয়াতলায় তাঁর বন্ধু সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি।
                         তবে কোন অবস্থাতেই নিজের পছন্দ জোর করে চাপিয়ে দিয়ে সুজাতা চক্রবর্তী র রেকর্ডিং কিন্তু বন্ধ করলেন না ।পরবর্তীকালে সেই গানটি বাংলা ফিল্মি গানের জগতে কি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তা সমকালীন শ্রোতাদের মনে আছে ।
               অপর একটি ঘটনা ।অসুস্থ উৎপলা সেন কে দেখতে তাঁদের কড়েয়া আবাসনের ছোট্ট ফ্ল্যাটে এসেছেন সস্ত্রীক হেমন্ত ।চলে যাওয়ার সময় খুব আস্তে উৎপলা কে বললেন ,পরে তোর বালিশের নীচ টা একটু দেখিস।
হেমন্ত চলে যাওয়ার পর  উৎপলা দেখেন একটি খামে কুড়ি হাজার টাকা রেখে গেছেন তাঁর  হেমন্তদা।আটের দশকের প্রথম লগ্নে সেটা কিন্তু কম টাকা নয়। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বোধ ই হেমন্তের সমাজমনস্কতার ভিত্তি নির্মাণের উৎস স্থল ।আর সেই উৎস নির্মাণে সবথেকে বড় ভূমিকা নিয়েছিল বামপন্থী আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রতি কৈশরের সূচনা লগ্ন থেকে আমৃত্যু হেমন্তের বিশ্বাস হৃদয়ের অন্তস্থলের বিশ্বাস ।এখানেই নিহিত রয়েছে শিল্পী হেমন্ত কে অতিক্রম করে সমাজমনস্ক, সমাজের প্রতি চরম দায়বদ্ধ ,মানুষের শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্ম শতবর্ষ উদযাপনের এর সার্থকতা।
খ্যাতির শীর্ষ থেকে উঠেও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কখনো জাত্যাভিমানে ভোগেননি। এই কারনে তাঁকে অনেক সময় তাঁর নিজের মানুষজনের কাছে যথেষ্ট সমালোচিত হতে হয়েছিল। অনেক বাঙালি শিল্পীর কাছে মনে হয়েছিল, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বোম্বের ফিল্মি জগতের যথেষ্ট ভালো ভাবে  প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিকে কোনো অর্থেই সুযোগ-সুবিধে দেন না। আবার একাংশের কাছে মনে হয়েছিল, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বোম্বের গানের জগতে তথা  ফিল্মের জগতে নিজের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবার তাগিদে মারাঠীদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দেন ,এমনকি হিন্দিভাষীদের ও সুযোগ-সুবিধা দেন ,কিন্তু বাঙালিকে কোন রকম সুযোগ-সুবিধা দেন না।
                     এমন কিছু কথাবার্তা বলে তাঁর সমসাময়িক যুগের বেশকিছু শিল্পী খ্যাতির শীর্ষে থাকাকালীন সময় হেমন্ত সম্পর্কে অনেক ধরনের অসত্য প্রচার চারিদিকে চালাতেন ।এক শিল্পী কুমার শচীনদেব বর্মনের আমন্ত্রণে বোম্বে ফিল্মি জগতে গান গাইতে যান। হেমন্ত তখন শচীনদেবের বিভিন্ন ছবিতে গান গেয়েই ধীরে ধীরে নিজের আসন পাকা করছেন। বোম্বের গানের জগতে সেই শিল্পী ও শচীন কর্তার নির্দেশিত তিনটি হিন্দি ছবিতে গান গাইলেন। এমনকি শচীনকর্তা সেই শিল্পীকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফিল্মে  ডুয়েট পর্যন্ত গাওয়ালেন ,কিন্তু যে কোনো কারনেই হোক, হেমন্ত কন্ঠযুক্ত হয়েও বোম্বে ফিল্মি জগতের বাংলার সেই শিল্পীর গান সেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য পেল না ,বাণিজ্যিক সাফল্য পেল না।
                      মারাঠি ভাষা তে ভগিনী কে সম্বোধন করা হয়’ বাঈ’ বলে। যেমন গুজরাটি তে সম্মোধন করা হয় ‘বেন’ বলে। বোম্বে ফিল্ম জগতে তখন লতাজির প্রতিষ্ঠা ছিল লতাবাঈ হিসেবে ।সেই বাঙালি শিল্পী কেউ কেউ  তাঁর নামের সঙ্গে ‘ বাঈ’  শব্দ যোগ করে সম্বোধন করতে লাগলেন। ভগিনী সম্বোধনসূচক এই ‘বাঈ ‘ শব্দটি বাংলায় আবার বাইজি শব্দটির কাছাকাছি অর্থবোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
                 সেই কারণে শচীনদেব যাঁকে সেযুগের  বোম্বেতে নিয়ে গেছিলেন, সেই ব্যক্তিটি টি বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করতে না পেরে মনে করলেন, বাঙালি বিদ্বেষী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে একাধারে বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে দিচ্ছেন না ,অপরদিকে অসম্মানিত ও মর্যাদা দেওয়ার জন্য দায়ী  হিসেবে সম্বোধিত করেছেন ।
               সেই শিল্পী নিজের অসাফল্যের   দায় কার্যত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উপরে চাপিয়ে দিয়ে, শচীনদেব বর্মন কে কোনো কিছু না জানিয়ে ,একদম চুপিসারে বোম্বে ত্যাগ করে আবার কলকাতায় পুনর্মূষিক ভব হলেন ।এই ধরনের বহু বিদূষণ খ্যাতির বিরম্বনা হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে সারা জীবন সহ্য করতে হয়েছে।
                সেই শিল্পীর পতিদেবতাটি  একটা সময় হেমন্ত বিদূষণে সমস্ত রকমের মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, সল্টলেক স্টেডিয়ামে বামফ্রন্ট সরকার আয়োজিত একটি সংগীত অনুষ্ঠানে লতা মঙ্গেশকার গান গাইবার পর নাকি তাঁর পত্নী গান গাইবার আগে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত যশে মাইক্রোফোন খারাপ করে দেয়া হয়েছিল ।
                  অর্থাৎ;  হেমন্তের তথাকথিত ঈর্ষায় বোম্বের ফিল্মি জগতে পাত্তা না পাওয়া সেই শিল্পী যাতে প্রায় তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে সল্টলেক স্টেডিয়ামে গাইতে গিয়ে বেইজ্জত হন ,সেই জন্য মাইক্রোফোন খারাপ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করার মত হীন কাজ করতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দ্বিধা করেননি। এটিই  ছিল সেই শিল্পীর স্বামীর অভিযোগ এই ধরন।
                এমন অসভ্য অভিযোগ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে গোটা জীবনভর অনেক মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি অবিচল থেকেছেন নিজের আদর্শে, নিজের দৃঢ়তায়, নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে। ঘনিষ্ঠমহলে পর্যন্ত এই ধরনের নোংরা অভিযোগ সম্পর্কে একটি বারের জন্যে ও একটি রুচিহীন শব্দ কখনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি ।
             আজ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষের সময় কালে এসে এই নীলকন্ঠ হেমন্ত কে বারবার আমাদের মনে রাখা দরকার ।অপবাদের  হলাহল স্বকন্ঠে  ধারণ করে, জাদু কন্ঠের স্পর্শে শুধু বাঙালি নয় ,গোটা ভারতবাসীকে মোহিত করে রাখার অসামান্য, অনবদ্য ক্ষমতার ভেতর দিয়েই আমাদের কাছে সার্থক হয়ে ওঠে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো ক্ষণজন্মা শিল্পীর, ক্ষণজন্মা মানুষের জন্মশতবর্ষ পালনের সার্থকতা।
                    হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে জীবনে কখনো সংগীত সংক্রান্ত বিষয়ের খুঁটিনাটির বাইরে কোনো শিল্পীর সম্পর্কে কোনো রকম  ব্যক্তিগত স্তরের নেতিবাচক কথা বলতে শোনা যায়নি ।যে শিল্পীর কথা এখানে উল্লেখ করা হলো বোম্বে সংক্রান্ত গানের বিষয়ে,  সেই শিল্পী একদা সলিল চৌধুরীর সম্পর্কেও এধরনের কিছু রুচিহীন মন্তব্য করেছিলেন।
                 ব্যক্তিগত স্তরে তাঁর জীবনের একটি বিখ্যাত গানের সুর করেছিলেন সলিল চৌধুরী। গানটির সুর করবার জন্য নাকি সলিল স্বয়ং এসেছিলেন শিল্পীর বাপের বাড়িতে। শিল্পীর কাছে ব্যক্তি সলিলের চরিত্র এতই’ বিপদজনক'( !)  ছিল যে ,সলিল যতোক্ষণ তাঁর বাড়িতে ছিলেন, তিনি নাকি বাড়িতেই থাকেন নি।
                এই ধরনের রুচিহীন আক্রমণ সলিল এবং হেমন্ত উভয় কেই গোটা জীবনে কম সহ্য করতে হয় নি ।এই ধরনের আক্রমণের শিকার সলিল , হেমন্ত– এই দুই জনেই  কেন একযোগে হয়েছিলেন ,তার উত্তরটা আমাদের কাছে স্পষ্ট।
             উত্তরটা হলো;  যেমন হেমন্ত, তেমন সলিল ,কোনদিন, কখনো নিজেদের বিশ্বাসের জগৎটাকে, প্রগতিশীল ভাবধারার বাইরে অতিবাহিত করেন নি ।প্রগতিশীল সমাজের পক্ষে শুধু কণ্ঠ নয়, নিজের ভাবনা, নিজের বোধ, নিজের চেতনাকে প্রসারিত করবার জন্য বিনোদন জগতের নানা ধরনের রাজনীতির শিকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে গোটা জীবন ধরে হতে হয়েছে।
                 হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে খবরের কাগজের পাতায় আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তি চরিত্রকে ইংগিত করে অত্যন্ত নোংরা কুরুচিকর কথা পর্যন্ত বলতে দ্বিধাবোধ করেননি। অথচ ওই  আরতির মতো শিল্পীর  হেমন্ত বেঁচে থাকতে কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারণ করবার মতো সাহস হয়নি।
                 হেমন্ত সম্বন্ধে , হেমন্তের  চরিত্র সম্বন্ধে যদি আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীর কোনো প্রশ্ন থেকে থাকে, তাহলে কেন সেই প্রশ্ন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবৎকালে উচ্চারিত হলো না? ‘ অমর গীতি ‘ ছবিতে  হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন ।
                 সেই ছবির গান গাওয়া নিয়ে তখন কেন প্রকাশ্যে মুখর না হয়ে, যেদিন মৃত  হেমন্ত  তাঁর সম্বন্ধে অপপ্রচারের কোনো জবাব দিতে পারবেন না,  সেদিন প্রতিবাদী হলেন আরতী মুখোপাধ্যায়। একই ভাবে বলতে হয়, ছয়ের দশকের শেষ দিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কোনোরকম প্রথাগত স্বাক্ষর না নিয়ে মৌখিক সম্মতি না নিয়ে, কিছু লোকজন, তাঁকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে টেনে আনার চেষ্টা করেছিল। সেদিনও কিন্তু নীলকন্ঠ হেমন্ত, নিজের ব্যক্তিত্বের জোরে এসে অপবাদের মোকাবিলা  করেছিলেন। বেদনায় দীর্ণ হয়েছিলেন ।ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কখনও রুচিহীন ,নিম্নমানের একটি শব্দ উচ্চারণ তিনি করেননি।
                   দৈহিক উচ্চতা র মতো  মানসিকতা, মননশীলতা, মেধা, সর্বোপরি হৃদয়ের যে অসামান্য উচ্চতা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছিল, সেই উচ্চতার পরিমাপ ই  হওয়া দরকার আজ জন্মশতবর্ষের মুহূর্তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *