শ্রেণীচিন্তার ফসল ঋত্ত্বিকের সৃষ্টি

ঋত্ত্বিক ঘটকের জন্মদিন বাঙালির আত্মানুসন্ধানের দিন ।একজন ‘বাঙালির আত্মানুসন্ধানের দিন ‘শব্দটি এই আলেখ্য রচনার শুরুতেই লেখা হয়ে গেল , এই টা দেখবার পরেই প্রশ্নটা লেখকের মনে এক অন্তহীন জাগর হিশেবে যেন জেগে উঠল। ঋত্ত্বিক কি কেবলমাত্র বাঙালির? ঋত্বিক কি কেবলমাত্র ভারতবাসীর ?নাকি ঋত্বিক দেশ-কালের সীমানা অতিক্রম করে ,পৃথিবীর সব যন্ত্রণা বুকে সওয়া মানুষের ?
আজকের স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের পাবনা জেলার বেড়ার ভাড়েংগা গ্রাম, যে গ্রামটি আজ পদ্মা গর্ভে বিলীন ,তার গহীনে যে ঋত্বিকের পূর্বপুরুষের নাড়ী পোঁতা আছে, সেই মৃত্তিকার উত্তাপ পাওয়া, জল -মাটি- আগুনের ওম কি ঋত্ত্বিকের শাশ্বত চেতনাকে আজও ধারণ করে নেই? ভাড়েংগা গ্রামটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর, ঘটক পরিবার নতুন করে পততনি তৈরি করেন যে গ্রামে , সেটির পরিচিতি,নতুন ভারেঙ্গা নামে।
এই যে মাটি থেকে ছিন্ন হয়ে আবার মাটিতে ই শেকড় বিস্তার করা, এই,’ হেথা নয় ,হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে ‘ পূর্বপুরুষের হাতে হাত রাখা মৃত্তিকার ঘ্রাণ ই ঋত্ত্বিককে চিরকালীন দ্রোহে দীপ্তমান করেছে। সেই দীপ্তির আগুন দেশকাল সমাজের সীমাকে অতিক্রম করে, মানুষের চিন্তা চেতনার প্রতিটি কোষ কে গতকাল, আজ, আগামীকাল ,এমনকি ভাবি কাল পর্যন্ত অনুরণিত করে যাবে।
কীর্তিনাশার কীর্তিতে যে শেকড় ছেঁড়ার ঋত্ত্বিকের পূর্বপুরুষের শিরায়- উপশিরায় প্রবাহিত হয়েছিল, সময়ের অ কৃপণ তুচ্ছ মরুবালু রাশির ভিতর দিয়ে তা ঋত্বিকের স্নায়ুকে পুষ্ট করেছিল। তাই তাঁর সৃষ্টিতে কেবল যে দেশভাগের যন্ত্রণা অনুরণিত হয়েছে তা কিন্তু নয় ,শিকড় ছিঁড়ে গেলে , তা কিভাবে ‘ সময়’ কে ধর্ষণ করে ,তার মর্মস্পর্শী খোদাই চিত্র মানব সভ্যতার বুকে গ্রথিত করে গেছেন ঋত্ত্বিক।তেমন ভাস্কর্যের নিদর্শন বোধহয় গোটা বিশ্বে খুব বেশি পাওয়া যায় না।
যুগ যন্ত্রণার আণুবীক্ষণিক বোধ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক চেতনাকে ঋত্বিক সবার উপরে ঠাঁই দিয়েছিলেন। সেই কারনে দেশভাগের যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত ঋত্ত্বিকের সামগ্রিক সৃষ্টিকে এককথায় অভিহিত করতে গেলে বলতে হয় ;শ্রেণী চিন্তার এক অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ।মানুষের শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণা যে কোনো অবস্থাতেই শ্রেণী নিরপেক্ষ হতে পারে না, ভারতীয় চলচ্চিত্রে সম্ভবত ঋত্বিক ই প্রথম সেটি আদ্যন্ত সফলভাবে দেখিয়েছিলেন।
শ্রেণীবোধ এবং শ্রেণী ঘৃণা , দুটি ই কী ভয়ঙ্কর তীব্র হলে এই ধরনের কালজয়ী সৃষ্টি সম্ভব হয় ,তা ঋত্ত্বিকের কেবল চলচ্চিত্রগুলি তে ই নয়, তাঁর ছোট গল্প ,নাটক, এমনকি বিকল্পধারার রাজনৈতিক বোধের ভিতরেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যায়।
নর-নারীর প্রেম কে শ্রেণীভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত একটি চেতনার জগতে উপস্থাপন ঋত্বিক ঘটকের সামগ্রিক সৃষ্টির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ।শ্রেণী সচেতন নর-নারীর সম্পর্ক ঋত্ত্বিকের আগে ভারতীয় তথা বাংলা সাহিত্যে এলেও , চলচ্চিত্র জগতে, সম্পর্কের এই শ্রেণীগত বিন্দুর উপস্থাপন, ঋত্ত্বিকের আগে সেভাবে হয়নি ।
শিকড় ছেঁড়া হাতের খোঁজে ঋত্বিককে চিরদিন ছুটে বেড়াতে হয়েছে বলেই হয়তো তাঁর সৃষ্টিতে সমসাময়িক কালের অনেক স্রষ্টার মতো নিপাট, গোছানো দিকগুলি অনেকাংশে আমরা কম দেখতে পাই ।কারো কারো কাছে ঋত্বিকের এই নন মেথডিকাল অভিব্যক্তির দরুন, তাঁকে অনেকটাই খাটো করে দেখানোর একটি দস্তুর দেখতে পাওয়া যায়।
এই অভিব্যক্তির নিরিখে ঋত্বিককে অনন্য সাধারণ একজন স্রষ্টার শংসা দিতেও অনেকে র ই একটু নাক সিঁটকনো ভাব আছে।এই ভাবটি সম্পর্কে একটা কথা ই অত্যন্ত জোরের সাথে বলতে হয় যে, এমনটা যাঁরা ভাবেন, তাঁরা শিকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা থেকে শ্রেণী চিন্তার অভিব্যক্তি কোনো কিছুর ই গভীরে অনুভবের মতো ধী শক্তি সম্পন্ন লোক ই নন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *