বিধানসভার ফলে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই


সদ্য সমাপ্ত কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, বিজেপির তথাকথিত বিজয় বৈজয়ন্তী প্রতিকূল হাওয়ার জেরে আর সেভাবে উড়তে পারছে না ।বস্তুত এই বছরের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির মনে করে নিয়েছিল যে ,এরপর থেকে তারা কার্যত অজেয় ।হিটলার যেমন একসময় মনে করেছিলেন যে, বিশ্বের কোনো শক্তিই তাকে প্রতিহত করতে পারবে না। তেমন ই মানসিকতা ধীরে ধীরে ভারতের রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির মধ্যে গেঁথে যেতে শুরু করেছিল।
এই ভাবনাকে প্রতিহত করবার ক্ষেত্রে হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র বিধানসভার ফলাফল ,কেরলের কয়েকটি কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ফলাফল কেবলমাত্র বড় ভূমিকা নেবে তাই নয় ; এই ফলাফল ,ভারতের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে আগামী দিনে একটি নির্ণায়ক দিশা রেখবে বললে মনে হয়না অত্যুক্তি হবে। মানুষকে ভাবাবেগে ভাসিয়ে দিয়ে কিছুদিনের জন্য ভুলিয়ে রাখা হয়ত সম্ভব ।কিন্তু সেই মোহনিদ্রা থেকে জেগে উঠলে মানুষ পেট ভরে খেতে চাইবে।চাকরি চাইবে।স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা চাইবে। শিক্ষা অধিকার চাইবে।সব ধরণের নিরাপত্তা চাইবে। সব ধরনের অধিকার চাইবে। নিজের মতো করে, নিজের ধর্ম পালন করতে চাইবে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারা বজায় রাখতে চাইবে।ভাষাগত বৈচিত্রের ধারা বজায় রাখতে চাইবে।
মানুষের এই চাওয়া গুলি যে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ভিতর দিয়ে খুব বেশিকাল আর আগামী দিনে ভুলিয়ে রাখা সম্ভবপর হবে না –তারই ইঙ্গিত কিন্তু সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা গুলির নির্বাচনের ফলাফলের ভিতর দিয়ে উঠে আসছে। হরিয়ানার জনাদেশ ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের পক্ষে যায়নি। অথচ সেই জনাদেশ কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঘোড়া কেনাবেচা ভিতর দিয়ে বিজেপি সে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করছে ।গণতন্ত্রকে এইভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করার বিষয়টা যে কেবল হরিয়ানার মানুষ নয়, গোটা ভারতবর্ষের মানুষই আগামী দিনে কোনো অবস্থাতেই ভালোভাবে নেবে না– সে কথা কিন্তু এখনই হলফ করে বলতে পারা যায়।
প্রথম দফার মোদির শাসনকালে র সার্বিক ব্যর্থতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ,অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ,সামাজিক ব্যর্থতা ,সংস্কৃতিক ব্যর্থতা –এই সমস্ত কিছুকে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএসের ধারাবাহিক সামাজিক প্রযুক্তি দিয়ে ঢেকে রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ।সেই চেষ্টার ফসল কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ।দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা ,ভয়াবহ দারিদ্র, বেকারত্বের তীব্র জ্বালা, সামাজিক বিভাজনের জেরে ভারতবর্ষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ঘোরতর সংকট ,ভারতবর্ষের বৈচিত্রময় সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষা ঘিরে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের ভিতরে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া সংশয়ী মানসিকতা –এই সবকিছুর যে সঠিক বহিঃপ্রকাশ ভোটের রাজনীতির ভিতর দিয়ে গত লোকসভায় ঘটতে পারেনি– তা লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাসের ভিতরে ,দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিধানসভা নির্বাচন গুলির ফলাফলে শতাংশের বিচারে বিজেপির ভোটের হার উল্লেখযোগ্য রকমের কমছে ;তার ভিতর দিয়ে খুব ভালোভাবে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
সদ্য নোবেলজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বিগত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করবার ক্ষেত্রে এক জায়গায় উল্লেখ করেছিলেন; শাসক দলের বাইরে সর্বজনমান্য নেতৃত্বের অভাবের বিষয়টি ।অভিজিত বাবুর এই বিশ্লেষণ যে সর্ব অর্থে যথার্থ ছিল; লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল, তার পরবর্তী কালের ভারতবর্ষের রাজনীতির গতি প্রকৃতি, বিশেষ করে দ্বিতীয় দফার নরেন্দ্র মোদি সরকার কর্তৃক সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা এবং ৩৫ ক ধারার অবলুপ্তি ,কাশ্মীরকে কার্যত একটি কয়েদখানায় পর্যবসিত করা ইত্যাদির ভিতর দিয়ে যে পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ,তার নিরিখে প্রমাণিত।
সর্বজনমান্য বিরোধী নেতৃত্ব যদি প্রতিষ্ঠিত হতে পারত, তাহলে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এখন ই একটা বড় রকমের অস্তিত্ব অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াতো – তা হলফ করে বলা যায়। ভারতবর্ষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেমন বৈচিত্র আছে, বহুত্ববাদ আছে, আবার সমন্বয়ী চেতনাও আছে ,তেমন ই সমন্বয়ী চেতনা কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকে সে ভাবে প্রতিভাত হয় না।
বুর্জোয়া রাজনীতির মধ্যে যে ভয়ঙ্কর ক্ষমতা দখলের মানসিকতা, ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসিকতা ,সেই মানসিকতার ভিতরে দলের স্বার্থ যতখানি সামনে আসে ,দেশের স্বার্থ তার একাংশ আসেনা ।ফলে নেহরুর শাসনকালে ও যেমন নেহেরু কে ঘিরে সমর্থন ও প্রতিবাদের ভিতর দিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির মধ্যে একটা দোলাচল তৈরি হয়েছিল , সেই দোলাচালে সুযোগ কিন্তু রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক ,মৌলবাদী শিবির খুব ভালোভাবেই নিয়েছিল।
পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধীর নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার স্বার্থে যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, সেই পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে একদিকে বুর্জোয়া রাজনীতির মধ্যে এসেছে বিভ্রান্তি। অপরপক্ষে কমিউনিস্টরা জাতীয় ঐক্যমতের প্রশ্নেও স্বৈরাচারী ইন্দিরার ভূমিকার সমালোচনা, বিরোধিতা করবার রাস্তা ছাড়া অন্য কোনো জাতীয় স্বার্থের সমর্থনে তাঁকে রাস্তায় হাঁটতে সক্ষম হয়নি ।ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের প্রশ্নে ইন্দিরার প্রতি সমর্থন দিয়ে কমিউনিস্টরা কিন্তু প্রমাণ করেছিল, জাতীয় স্বার্থে তাঁরা পিছিয়ে থাকবেন না।এই প্রেক্ষিত টিকে ইন্দিরা তাঁর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার মানসিকতার দরুন কাজে লাগাতে পারেন নি।ফলে শেষপর্রনাত লাভবান হয়েছে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা।
নিজেদের কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিয়ে শ্রেণি সহযোগিতার তত্ত্বে বিশ্বাসী লোকেরা বুর্জোয়া রাজনীতির মতই নিজের বা দলীয় স্বার্থের সমর্থনে ইন্দিরার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।ইন্দিরা যতই শক্তিশালী হয়েছেন ,স্বৈরাচারী হয়েছেন ,ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছেন ?ততোই কিন্তু প্রকারান্তরে তিনি হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তিকে সংহত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
রাজনীতির প্রাঙ্গণে ইন্দিরার বিরোধিতার নাম করে বুর্জোয়া রাজনীতির মধ্যে ঐক্য সাধনে একটা হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের একটা সমন্বয়কারী ভূমিকার দিকে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন ইন্দিরাই।পন্ডিত নেহরুর আমলে ,অন্ধ নেহরু বিরোধিতার ভেতর দিয়ে রামমোহর লোহিয়া যেভাবে একটা সময় জনসংঘ তথা তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএস কে সহযোগিতা করেছিলেন, তেমনি পরবর্তীকালে জয়প্রকাশ নারায়ণ আরএসএস কে এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
এই প্রেক্ষিত কেই কিন্তু আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি তাদের রাজনৈতিক বিস্তারের ক্ষেত্রে সব রকম ভাবে ব্যবহার করে চলেছে ।সামাজিক প্রযুক্তির( সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ভেতর দিয়ে কিভাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে ধীরে ধীরে মানুষের চিত্রগ্রহণ যোগ্য করে তুলছে –তার সম্বন্ধে সার্বিকভাবে সর্বস্তরের মানুষের কতখানি ধ্যান ধারণা আছে তা রীতিমতো সন্দেহের বিষয় ।একথা কখনোই ভুলে গেলে চলবে না যে; আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে দেখে, তাদের কার্যকলাপ দেখে, তাদের রাজনৈতিক বিস্তারের আদব কায়দা দেখে ,এদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আমরা সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারব না।
বিজেপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে মুখে বা সভা-সমিতিতে যাই বলুক না কেন ,আরএসএসের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন ব্যতীত তাদের একটি পা ফেলবার মতো ক্ষমতা নেই। আর বিজেপিকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত করবার জন্য আরএসএস তাদের প্রকাশ্য ও গোপন সংগঠন গুলির ভিতর দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ,বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক- সাংস্কৃতিক -ধর্মীয় পরিবেশ কে ব্যবহার করে কি ধরনের কাজকর্ম করে চলেছে– তার সম্পর্কে অ বিজেপি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির , এমন কি বামপন্থী দলগুলির ও সার্বিক ধারণা পরিপূর্ণভাবে আছে বলে মনে হয় না।
এইরকম একটা পরিস্থিতির ভিতরে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের ভয়াবহ সামাজিক প্রযুক্তির ছত্রছায়ার ভিতরে থেকেও হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র বেশিরভাগ মানুষ যে কিভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে তাদের মত দিয়েছেন ; তার রাজনৈতিক প্রেক্ষিত কে যদি সমস্ত অ বিজেপি রাজনৈতিক দলগুলি সঠিকভাবে উপলব্ধি করে ,বিচার-বিশ্লেষণের ভিতর দিয়ে নিজেদের কর্মপন্থা কে পরিচালিত করতে না পারেন ,রাজনৈতিক সংগ্রামকে পরিচালিত করতে না পারেন ,তাহলে কিন্তু কেবলমাত্র বিজেপিকে রোখা নয়; প্রবাহমান কাল থেকে যে বহুত্ববাদী ,সমন্বয়ী চেতনার উপর আমাদের এই ভারতবর্ষ দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভারতবর্ষকে রক্ষা করা সম্ভব নয় ।
এই নির্বাচন এটা প্রমাণ করল যে ,কেরালা তে সেখানকার বামপন্থী সরকার শবরীমালা মন্দিরে মেয়েদের প্রবেশাধিকার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লাগু করে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন , সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা কে ধর্মান্ধতা, জাতপাতের আড়ালে ঢেকে দিয়ে, কেবলমাত্র কেরলের নয়, গোটা ভারতবর্ষের সামাজিক প্রেক্ষিত কে পেছনদিকে নিয়ে যাওয়ার যে নক্কারজনক চেষ্টা হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শিবির করেছিল ,সেই চেষ্টা মানুষ প্রতিহত করেছেন।
কেবলমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনাকে সামনে রেখে মানুষের প্রতি আকারের প্রতিহত করবার ভাবনা ভেবেছেন ?তা কিন্তু নয় ।মানুষের কাছে প্রথম এবং প্রধান বিষয় হয়ে উঠে এসেছে; কেরালার বামপন্থী সরকারের বিকল্প অর্থনৈতিক -রাজনৈতিক- সামাজিক চিন্তা-চেতনা ,দৃষ্টিভঙ্গি ও তার প্রয়োগ জনিত প্রেক্ষাপটটি ।
ধর্মের বটিকা থেকে মানুষের কাছে কিন্তু প্রধান হয়ে উঠেছে পেটের খিদের বিষয়টি ।স্বাস্থ্যের বিষয়টি। শিক্ষার বিষয়টি। বাসস্থান, সংস্কৃতিক, সামাজিক বৈচিত্র্যকে বজায় রাখবার বিষয়টি ।কেরালার মানুষের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সচেতনতা সার্বিকভাবে মহারাষ্ট্র বা হরিয়ানার মানুষদের মধ্যে ও কাজ করেছে তা কিন্তু নয় ।তবুও হরিয়ানা বা মহারাষ্ট্রের মানুষের কাছে ধর্মের থেকে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পেটের খিদের জ্বালা টি। বড় হয়ে উঠেছে বেকারত্বের যন্ত্রণা টি। সাধারণ মানুষের কাছে বাজার অর্থনীতির নামে দেশের বাজারকে আন্তর্জাতিক স্তরে বহুজাতিক ,যাদের আড়ালে রয়েছে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কান্ড কারখানা টি আর কোনমতেই আড়াল করে রাখা যাচ্ছে না ।
নির্বাচনের ফলাফলে এইসব বিষয়গুলি কিন্তু খুব বড় রকমের নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আগামী মাসে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঘিরে এই নির্বাচনী প্রচারে নানা ধরনের সামাজিক বিভাজন তৈরি করবার কম চেষ্টা আরএসএস তাদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগী সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে দিয়ে করে নি। সাধারণ মানুষ কিন্তু ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করবার সেইসব রাস্তা থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে খাদ্যের দাবি কে। বাসস্থান ,স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ,ধর্মীয় ,সামাজিক ,সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার দাবি গুলিকে।
আধা-সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক পরিকাঠামোর যে প্রেক্ষিত হরিয়ানাতে জাতপাত নির্ভর জাঠ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সমস্ত ধরনের বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত লালন পালন করে এসেছে ,সেই পরিকাঠামোর ভিতরে দাঁড়িয়েই মানুষ যে বিদ্রোহী হয়েছে ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে– তা ভারতবর্ষের আগামী রাজনীতির প্রেক্ষিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিধানসভা নির্বাচনের এই ফলাফল দেখে আমরা যদি ধরে নিই যে, বিজেপির মৃত্যু ঘন্টা বেজে গেছে; তাহলে কিন্তু আমরা আবারও ভুল করব। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বিজেপি কিন্তু রাজনীতিগত পরিমণ্ডলে মুখ্য বিষয় নয় ।মুখ্য বিষয় হলো তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএস ।আরএসএস যদি বিজেপিকে শুইয়ি রাখে, বিজেপির শুয়ে থাকবে। আরএসএস বিজেপি কে যদি পাশ ফিরিয়ে শোয়ায়, তাহলে তারা পাশ ফিরে শোবে। চিত করে শোয়ালে চিত করে শোবে।উপুড় করে শোয়ালো, উপর করে শোবে।বসিয়ে রাখলে, বসে থাকবে।
তাই চরম প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ,মৌলবাদী হিন্দু রাজনৈতিক হিন্দু সংগঠন বিজেপিকে যদি প্রতিহত করতে হয়, তাহলে প্রতিহত করতে হবে তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএস কে ।এবং অবশ্যই তাদের হাজারো বর্ণের প্রকাশ্য ও গোপন সংগঠনগুলোকে ।এজন্য কিন্তু প্রয়োজন আরএসএসের সামাজিক সংস্কৃতির পালটা একটি সামাজিক সংস্কৃতি ।সেই সামাজিক সংস্কৃতি প্রেক্ষাপট যদি বহুত্ববাদী ভারতবর্ষের নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হয়, তাহলে প্রয়োজন এমন একজন বিকল্প নেতা, যিনি এই দানব শক্তিকে একাধারে বীরত্ব ,রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ,পক্ষপাতহীন ,প্রেমিক মানসিকতা সম্পন্ন ,প্রত্যুৎপন্নমতিপূর্ণ ,অন্ধ আবেগ হীন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে পারেন ।তেমন নেতা ভারতবর্ষে নেহরু ঘরানার পরে একমাত্র ছিলেন জ্যোতি বসু ।একটা সময় আমরা দেখেছি ,গোটা ভারতবর্ষের নানা বর্ণের, নানা মতবাদের রাজনৈতিক দল, তাঁদের কর্মী ,সমর্থক ,নেতৃত্ব ‘জনগণমন অধিনায়ক’ হিসেবে জ্যোতিবাবু কে বরণ করে নিতে চেয়েছে ।
তেমন বিকল্প নেতৃত্ব ই পারে আরএসএস গোটা ভারতবর্ষজুড়ে যে প্রলয়ংকর মানসিকতা তৈরি করেছে, বিধ্বংসী সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যার ভিতর দিয়ে তারা ভারতবর্ষের রাষ্ট্রশক্তিকে দখল করে, সেই শক্তিকে চিরকালীন করতে চাইছে ,সেই সার্বিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, ভারতবর্ষের সব রকমের মানুষের, সব রকমের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক -সামাজিক- ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যগুলি বজায় রেখে, একটি বিকল্প ধারার ভিতর দিয়ে ,বহুত্ববাদী ভারতবর্ষ ,সমন্বয়কারী ভারতবর্ষকে টিকিয়ে রাখতে ।সেই নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এখন একটিমাত্র মানুষের আছে। তিনি হলেন আমাদের এই বাংলার এক উজ্জ্বল সন্তান, মহম্মদ সেলিম।
কোনো ধরনের ধর্মীয়, প্রাদেশিক ,ভাষাগত পক্ষপাতিত্বের মধ্যে দিয়ে না হেঁটে ,এই মানুষটি তাঁর দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক জীবনে, সংসদীয় জীবনে ,যেভাবে একটি আদর্শগত ভিত্তির দ্যোতনা স্থাপন করতে পেরেছেন ,তাতে কথা স্পষ্ট করে বলতে পারা যায় যে, বহুত্ববাদী ভারতবর্ষকে সংকটের মধ্যে ফেলে, এক সংস্কৃতি( বলাবাহুল্য নাগপুরের আর এসএসীয় রাজনৈতিক হিন্দু সংস্কৃতি)র ভিতর দিয়ে ভারতবর্ষকে ধ্বংস করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে- তাতে সেলিম ই পারেন জ্যোতি বাবুর মতোই, সমস্ত ধরনের ভিন্ন মানসিকতা, ( অবিজেপি , অ প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক) অসাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির গুলির ভিতরে একটা যোগসূত্র তৈরি করে ,একটি ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করে ,সাম্প্রদায়িক শক্তির আগ্রাসন ঠেকাতে।
হরিয়ানা ,মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে যদি আমরা মনে করি ;বিজেপি ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করেছে এবং এখন সেই ক্ষয়িষ্ণুতার ধারা বজায় রেখেই তারা স্বাভাবিক নিয়মে রাজনীতির প্রেক্ষাপট থেকে হারিয়ে যাবে– তাহলে আমরা অত্যন্ত ভুল ধারণা করব ।আরএসএস কিন্তু তাদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়। এমন শিক্ষা কিন্তু ভারতবর্ষের অন্য বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো নেয় না ।কমিউনিস্টরাও নেয় না ।
আরএসএস কিন্তু সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষিতে তাদের শাখা সংগঠন যেগুলোকে, যাদের আমরা সংঘ পরিবার বলে থাকি, সেগুলিকে আরো নতুন কৌশলে সঙ্ঘবদ্ধ করে , তাদের সামাজিক প্রযুক্তির ধারা প্রকৃতিতে অদলবদল ঘটিয়ে ভোট রাজনীতির ভিতর দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতাকে দখল করা, সেই দখলকে বজায় রাখার জন্য নিত্য নতুন পথে হাঁটবে। সেই পথ শুরুতেই কেটে দেওয়া প্রতিটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক নাগরিকের কর্তব্য ।
শবরীমালা জেলাতে ওই মন্দিরে নারীর প্রবেশাধিকার ঘিরে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলতা চালিয়ে বিজেপির সফল হয়নি ।ভোট রাজনীতিতে এটাই যদি আমাদের কাছে স্বস্তির চিরস্থায়ী একটি প্রতিকার বলে ধরে নেয়া হয় ,তাহলে তার থেকে বড় ভুল কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে আর কিছু হতে পারে না। কোনো অবস্থাতেই আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ;কোনরকম বাঁধা এলে সেই বাধাকে অতিক্রম করবার জন্য আরএসএস চেষ্টার এতোটুকুই ত্রুটি করেনা ।
এক পা এগোবার জন্যে দুই পা পিছতে তাদের এতোটুকু নিও দ্বিধা- সংকোচ নেই ।তাই হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ইত্যাদি রাজ্যে নির্বাচন আশানুরূপ ফল না করার জন্য তারা তোদ্যম হয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাবে –এটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা কিন্তু নতুন উদ্যমে ,নতুন কৌশলে, ষড়যন্ত্রের জালকে আরো অনেক বেশি তীব্র ,তীক্ষ্ণ করে আক্রমন শানাবে।
সেই আক্রমণ কে আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে। সর্ব অর্থেই আমাদের মনে রাখা দরকার; প্রতিক্রিয়াশীলতার পাল্টা জবাব কিন্তু ভিন্নতর প্রতিক্রিয়াশীলতা নয়। উগ্র সাম্প্রদায়িকতার জবাব কিন্তু নরম সাম্প্রদায়িকতা নয়। ধর্মীয় জাতীয়তার জবাব কিন্তু ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা নয়। এক জাতি ,এক নেতা ,এক নীতির- জবাব কিন্তু বাঙালিয়ানা বা বিহারিয়ানা কিংবা উৎকল অস্মিতা নয় ।বুর্জোয়া রাজনীতিকরা ধর্মীয় জাতীয়তার পাল্টা হিসেবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাকে তুলে ধরতে চাইছে ।বুঝে হোক না বুঝে হোক; একাংশের বামপন্থীরা এই হুজুগে মেতে উঠছেন। এই কর্মী-সমর্থকদের সংযত করার জন্য বাম নেতৃত্বে ভিতর থেকে উল্লেখযোগ্য প্রয়াস কিন্তু এখনো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এই প্রবণতা যদি চলতেই থাকে ,তাহলে হরিয়ানা ,মহারাষ্ট্র বা কেরলের উপনির্বাচনে বিজেপির খারাপ ফল জনিত জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে যে একটি নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার উপক্রম হয়েছে, সেই গোটা পরিবেশ-পরিস্থিতি অচিরেই মাঠে মারা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *