অসম এবং এন আর সি ও সাম্প্রতিক প্রেক্ষিত


গৌতম রায়
এন আর সি ঘিরে এখন গোটা দেশব্যাপী বিতর্ক ।২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই বিতর্কটি কার্যত রাজনীতির শীর্ষবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এন আর সি র বিষয়টি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতই আসামেও একটি বড় রকমের বিতর্কের পরিবেশ তৈরি করেছিল। সে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করবার পর, সেখানকার রাজনৈতিক কার্যক্রমে এন আর সি একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আসামের প্রেক্ষিতে এন আ র সি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আমাদের প্রথমেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যটির ব্রিটিশ আমল থেকে ভৌগলিক সীমারেখা ঘিরে ইতিহাসের দিকে একটু নজর দেওয়া দরকার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা ১৮৭৪ সালে প্রথম বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে আসাম কে আলাদা করেছিল। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বঙ্গভঙ্গ করেন, তখন ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই আসাম প্রদেশ টিকে জুড়ে দেয় সদ্য গঠিত পূর্ববঙ্গের সঙ্গে।
হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রবল প্রতিরোধের ফলে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি বাধ্য হয়েছিল এই বঙ্গভঙ্গ রদ করতে। বঙ্গভঙ্গ রদের পর আসাম কিন্তু ১৮৭৪ সালের পরবর্তী সময়ে যে প্রশাসনিক অবস্থানে ছিল ,সেই অবস্থানে আবার ফিরে যায়, অর্থাৎ; আসাম একটি পৃথক প্রশাসনিক প্রদেশ হিসেবে ই তখন পরিগণিত হতো।
১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি নির্দেশিকার মাধ্যমে সপ্তম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেকটি ছাত্র-ছাত্রীর মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় ।এই স্বীকৃতির ফলে আসামের বাঙালিরা তাঁদের মাতৃভাষা বাংলায় পড়াশোনা করার সুযোগ পান। আসামের বাঙালিদের এই মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগের প্রবল বিরোধিতা করে ‘অসম এসোসিয়েশন’ নামক একটি সংগঠন। সম্ভবত জাতীয় আন্দোলন চলাকালীন সেই প্রথম বাঙালি ভাষা, সংস্কৃতির উপর অসমীয়া ভাষা সংস্কৃতির বিজয় প্রতিষ্ঠাতার নাম করে , একমাত্র অসমীয়া ভাষা য় শিক্ষাদানের দাবি জানানোর ভেতর দিয়ে এই ‘ অসম অ্যাসোশিয়েশন নামক সংগঠনটি প্রথম ঐতিহ্যশালী অসমে বাঙালি ও অসমীয়া দের ভিতরে একটা বিভাজনকে তীব্র করে তুলতে শুরু করে ।
ব্রিটিশ শাসনকালে র একটা বড় সময় জুড়ে আসামের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, শিক্ষা ,সামাজিক, সাংস্কৃতিক- প্রায় প্রত্যেকটি পরিমন্ডলে বাঙালিদের বিশেষ রকমের আধিপত্য ছিল ।এই আধিপত্যের দরুন আসামের বাঙালিরা যে সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপরে নানা ধরনের অবিচার চালাইনি –একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে ।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী যখন নির্বাচন হয়, তখন আসাম প্রদেশের প্রিমিয়ার হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সাদউল্লাহ(১৮৮৫-১৯৫৫) ।তাঁকে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পদচ্যুত করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নানা রাজনৈতিক কলাকৌশল ১৯৪৫-‘৪৬ সালের নির্বাচনকে প্রভাবিত করে সে রাজ্যে ক্ষমতাশীল হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদলৈ(১৮৯০-১৯৫০)।
কংগ্রেস নেতা গোপীনাথ বরদলৈ।
আসামের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার আগে সে রাজ্যে অসমীয়া অস্মিতার বিষয়টি প্রথম জোরদার হতে শুরু করে। নানা ঐতিহাসিক কারনেই বহুকাল ধরে আসামে বিভিন্ন ধরনের জাতিসত্তার মানুষের বাস। তাঁদের ভিতর বিভিন্ন আর্থ,সামাজিক ,সাংস্কৃতিক কার্যকারিতার ভেতর দিয়ে বাঙালিরা ছিল সেখানে বিশেষ রকমের উন্নত এবং এগিয়ে থাকা মানুষ।
বাঙালির সংখ্যা ও আসামে ছিল অন্যান্য যে কোনো জাতিসত্তার মানুষের থেকে অনেক বেশি। বস্তুত গোটা আসামের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের থেকে বেশি মানুষ হলেন বাঙালি। এই বাঙালির ভেতরে কিন্তু হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ ই রয়েছেন।
গত শতাব্দীর চারের দশক থেকে অসমীয়া জাতিসত্তার প্রশ্নটিকে উসকে দিয়ে, অসমীয়া অস্মিতা কে ক্রমশ বল্গাহীন করে দেওয়ার কাজটি প্রথম কংগ্রেসের নেতৃত্বে হতে শুরু করে , তখন কিন্তু অসমের মানুষদের ভেতরে তাঁদের নিজেদের রাজ্যে , নিজেদের একটা একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ঘিরে উচ্চাশা তৈরি হয়। সেই উচ্চাশা তে অসমের বাঙালিদের প্রধান শত্রু হিসাবে ধরে নেয় অসমীয়ারা।
এই যে উগ্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীনতার আগে থেকেই অসমে তৈরি হতে শুরু করে ,সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়েই সেখানে তৈরি হয়ে যায় বাঙালিদের শত্রু হিসেবে প্রতিপন্ন করবার এক ধরনের অপচেষ্টা ।বাঙালিদের শত্রু হিসেবে প্রচারের ক্ষেত্রে অসমীয়া দের যে কর্মকাণ্ড, সেই কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করবার কোনো চেষ্টা কিন্তু স্বাধীনতার আগে বা পরে কংগ্রেস দল করেনি।
এই জায়গা থেকেই কিন্তু বাঙালিদের শনাক্তকরণের প্রশ্নটিও ধীরে ধীরে সেখানে প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিল। সেই পথ ধরেই অসমীয়া অস্মিতা একটা সময় বাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রবল রক্তক্ষয়ী হিংসায় পর্যবসিত হয়। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ঘর জ্বালানো ,খুন-জখম- এসব হয়ে ওঠে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
গোপীনাথ বরদলৈ কংগ্রেসের প্রিমিয়ার হিসেবে স্বাধীনতার আগেই অসমের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর অসমের বাঙালি মুসলমানদের উপর তাঁর সরকার ভয়াবহ অত্যাচার করতে শুরু করে দেয় ।বাঙালি মুসলমানদের উপর বরদলৈ সরকারের অত্যাচার কে কেন্দ্র করে সেখানকার বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে তখন এই ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করে যে, বরদলৈ সরকার মুসলমানদের তাড়িয়ে ,বাঙালি হিন্দুদের জন্য নিরাপদ আসাম তৈরি করবেন ।
সেই কারনেই বরদলৈ সরকারের বাঙালি মুসলমানদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার নিয়ে অসমের বাঙালি হিন্দুরা কিন্তু কোনো প্রতিবাদে সোচ্চার তখন হননি ।বামপন্থীরা কিন্তু তাঁদের সীমিত রাজনৈতিক শক্তি নিয়েই বরদলৈ সরকারের এই জাতি ও ধর্মভিত্তিক বিভাজন প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে এবং সাধ্য মতো প্রতিরোধে তখন থেকেই সোচ্চার থেকেছেন।
অসমের সমস্ত অবামপন্থী রাজনৈতিক দল ই বিভিন্ন সময়কালে, বিভিন্ন পর্যায়ে ,অসমিয়া- বাঙালি জাতিসত্তাকে বিঘ্নিত করতে হিন্দু-মুসলমানের তাস খেলেছে ।তবে সেই তাস খেলে কোনো বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় এসে সফল হতে পারেনি ।
অসমে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির ভেতরে ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার প্রশ্নে ,সংস্কৃতিভিত্তিক সামাজিক ঐক্যের প্রশ্নে যে ঐক্য এবং সংহতি আছে, তা আজ পর্যন্ত সে রাজ্যের ক্ষমতাসীন কোনো রাজনৈতিক দলই কিন্তু ভাঙতে পারেনি ।স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বরদলৈ সরকারের তৈরি করা বিষবৃক্ষের প্রথম ফসল হিসেবে ১৯৪৮ সালে গৌহাটি শহরে এক বিধ্বংসী বাঙালি বিরোধী দাঙ্গা হয়েছিল।
সেই দাঙ্গায় বাঙালিদের ঘর- বাড়ির উপর ব্যাপক ভাঙচুর ,লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ হয় ।৫০ জনের -ও বেশি বাঙালি সেই দাঙ্গাতে ভয়াবহভাবে আহত হয়েছিলেন। একজন নিহত হয়েছিলেন।
এর ঠিক দু’বছর পরে ,অর্থাৎ; ১৯৫০ সালে গোটা অসম জুড়ে শুরু হয় ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার গোয়ালপাড়া, মঙ্গলদৈ, নওগাঁ ধুবড়ি — এইসব অঞ্চলগুলিতে ছিল বাঙালি আধিপত্য। তাই এইসব অঞ্চলগুলিতে বাংলা ভাষার প্রাধান্য যুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ছিল যথেষ্ট বেশি। সেইসব বাঙালি প্রধান স্কুলগুলিতে এই সময় অসম সরকার, বলাবাহুল্য, সেই সরকারের প্রধান ছিল কংগ্রেস , তাঁরা স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেয় ।
স্বাধীনতার বছরই দেখতে পাওয়া যায় , অসমের বাঙালি প্রাধান্য যুক্ত এলাকাগুলিতে ২৫০ টি প্রাইমারি স্কুলের মধ্যে ২৪৭ টি বাংলা মাধ্যমের স্কুল সরকারি অনুদান বন্ধ হওয়ার জন্য পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়।এই সময় থেকেই অসমে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকারী বাঙালিরা জীবন-জীবিকা রক্ষার তাগিদে অসাম ছাড়তে শুরু করেন।
অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র রাজ্য ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে ১৯৬০ সালে অসম বিধানসভায় প্রস্তাব পেশ করা হয় এবং সেই প্রস্তাব অনুমোদিত হয় ।বরাক উপত্যকার কাছাড়ের ১০ জন বাঙালি সদস্য একযোগে বিধানসভায় ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন।
বাঙালিদের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার প্রশ্নেও নানা ধরনের সামাজিক ও প্রশাসনিক আক্রমণ আসাম সরকার নামিয়ে আনতে শুরু করে ।১৯৬০ সালে জাতিসত্তার প্রশ্ন অসমের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় ৫০ জনেরও বেশি মানুষ খুন হন এবং ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন , এর প্রতিবাদে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদে ঐতিহাসিক আন্দোলন করেন ।
সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালের ১৯ শে মে মেয়ে ১১ জন বাঙালি শহীদ হন, তার মধ্যে একজন মহিলা ও ছিলেন ।কংগ্রেসী সরকারের পুলিশের গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন ৩০ জন আন্দোলনকারী ।
এই প্রেক্ষাপটের ভেতরেই রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে অসমে ভয়ঙ্কর রকমের অরাজকতা সৃষ্টিকারী অসম গণ পরিষদের নেতা প্রফুল্ল মহন্ত , ভৃগু ফুকনদের সঙ্গে এক চুক্তি সম্পাদিত হয় কেন্দ্রীয় সরকারের। অপরিণত রাজনীতিক রাজীব গান্ধীর এই কর্মকাণ্ড কে কঠিন কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস নেতা তথা পরবর্তীকালে কংগ্রেস ত্যাগী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন সেদিন বলেছিলেন ;
স্বাধীনতার সময়কালের গান্ধী, নেহেরু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই চুক্তি
রাজীব গান্ধী সম্পাদিত করেছেন।
বস্তুত গোপীনাথ বরদলৈ এর আমল থেকে জাতিসত্তার প্রশ্নে অসমে অসমীয়া অস্মিতাকে উস্কে দিয়ে, জাতিসত্তা এবং সাম্প্রদায়িকতাকে যেভাবে বল্গাহীন করে তোলা হয়েছিল। সেই বল্গাহীনতাকেই একটা নগ্ন বহিঃপ্রকাশের সুযোগ করে দেয়া হয় রাজীব গান্ধীর আমলে ১৯৮৫ সালের এই চুক্তির ভেতর দিয়ে ।
এই চুক্তির ভেতর দিয়েই অসমীয়া অস্মিতা সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশের নাগরিকদের অনুপ্রবেশের প্রশ্নটিকে।বাংলাদেশের নাগরিকদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করার দাবির ভেতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক আরএসএস ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি গোটা আসাম জুড়ে অসমিয়া – বাঙালি সংঘাতকে কার্যত হিন্দু-মুসলমান সংঘাতে পরিণত করে ।
বাংলাদেশের বেআইনি অনুপ্রবেশকারী নাগরিকদের বহিষ্কারের দাবি ভেতর দিয়ে কার্যত আসামে বসবাসকারী বাঙালি মুসলমানদের উপর অর্থনৈতিক ,সামাজিক ,সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক অবরোধ তৈরি করা হয়। সম্প্রদায়িক বিজেপির উদ্যোগে এই উদ্যোগে যে কংগ্রেস পর্দার আড়াল থেকে মদত জোগায় নি তা মনে করার আদৌ কোনো কারণ নেই ।
রাজীব – মোহন্ত চুক্তির ভেতর দিয়ে অসমের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে নাগরিকত্ব আইন এর ৬ এ ধারা তৈরীর যে পথ খুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটিকেই পরবর্তীকালে কেন্দ্রে এন ডি এ নামক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোট সরকারের প্রধান শরিক হিসেবে বিজেপির নেতৃত্বাধীন অটলবিহারী সরকারের ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ১৪ এ ধারা সংযোজনের সুযোগ করে দেয়।
বাজপেয়ির আমলে নাগরিকত্ব আইনের এই ১৪ এ ধারাতে কেবল অসাম নয় ,গোটা ভারতবর্ষজুড়ে বাধ্যতামূলক এন আর সি ,অর্থাৎ; নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল ।
দুঃখের কথা , বাজপেয়ী সরকার এই আইন তৈরি করবার পর ১০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার ।সেই সরকার ও কিন্তু একটি বারের জন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ১৪ এ ধারার কোনো রকম অদল বদল নিয়ে আদৌ ভাবনা-চিন্তা করে নি। প্রথম দফার ইউ পি এ সরকারের অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন বামপন্থীরা।
যে সময়কাল পর্যন্ত বামপন্থীরা কেন্দ্রে প্রথম দফার ইউ পি এ সরকারের সমর্থক ছিলেন ,সেই সময় কালে বামপন্থীরা বারবার জোরের সঙ্গে দাবি জানিয়েছিলেন ৩০০৩ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের তৈরি করা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের এর ১৪ এ ধারা টি কে নিয়ে ভাবনা চিন্তা করবার। কারন, এই বাধ্যতামূলক এন আর সি বা নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার ভেতর দিয়ে শাসক যে খুব সহজেই তার অপছন্দের মানুষের গায়ে বিদেশি তকমা লাগিয়ে, অপছন্দের মানুষকে, জোর জুলুম করে রাষ্ট্রহীন করে দিতে পারে — এই ভয়াবহ আশঙ্কার টি সেদিন একমাত্র বামপন্থীদের ই মনে এসেছিল। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব আইনের এই ভয়াবহ দিক টির একটি রক্ষাকবচ তৈরীর জন্য নানাভাবে মনমোহন সিং সরকারের নেতৃত্বাধীন প্রথম দফার ইউপিএ সরকারের কাছে দাবি, আর্জি ,অনুরোধ, আবেদন জানিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, কংগ্রেস দল বা প্রথম দফার ইউপিএ সরকার বামপন্থীদের সেই দাবি-দাওয়ার প্রতি আদৌ কোনো রকম কর্ণপাত করেন নি।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ও কিন্তু এই দশ বছর সময়কালে ২০০৩ সালে তৈরি হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের সংযোজিত ১৪ এ ধারাটি সম্পর্কে কোনোরকম উচ্চবাচ্য করেন নি। পরবর্তীকালে অসমের একটি সংগঠন, যাঁদের আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করত করে আরএসএস ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, তারাই সুপ্রিম কোর্টে এ সম্পর্কে একটি আবেদন করে।
সেই আবেদনের ভিত্তিতে তারা অসমে নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ শুরু করবার আদেশটি সুপ্রিম কোর্ট থেকে বের করতে সম্মত হয় ।পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে এই ধরনের উদ্যোগ ত্রিপুরা ঘিরেও শুরু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *