ঢাকার মিরপুরের ঝিলপাড় বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শুধু ধ্বংসস্তূপ

হাবিবুর রহমান, ঢাকা : রাজধানীর মিরপুর-৭ এর চলন্তিকা মোড়ের তিন হাজার বসত ঘরের ঝিলপাড় বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পর এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বস্তির চারদিকে এখন শুধুই পোড়া গন্ধ। প্রায় তিন ঘণ্টার আগ্নিকাণ্ডে সর্বস্ব হারিয়েছে বস্তিবাসী।

শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বস্তি পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শুধু অবশিষ্ট রয়েছে পোড়া টিন। কোনো কোনো স্থানে এখনো অল্প অল্প ধোঁয়া দেখা গেছে। দূর থেকেই বাতাসে পাওয়া যায় বস্তির পোড়া গন্ধ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা বস্তিতে ঢোকার জন্য ২১ ফুটের যে রাস্তা ছিল তা রিকশার গ্যারেজ আর দোকানে ভরা ছিল। রোড ভাড়া দিয়ে মাসিক টাকা নিতেন এলাকার প্রভাবশালীরা। তাদের দাবি, অন্তত ভেতরে প্রবেশের রাস্তাটি ফাঁকা থাকলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ভেতরে ঢুকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারত। অন্তত কিছু ঘর রক্ষা করা যেত। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় পানি সংকটে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বেগ পেতে হয়। পরে বস্তির আশেপাশের বাসাবাড়ির রিজার্ভ ট্যাংক থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ওয়াসার গাড়ি এনে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হয়। অগ্নিকাণ্ডে সর্বস্ব হারিয়ে বস্তিবাসী খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বস্তিটিতে বরিশাল ও ভোলাসহ বেশ কটি জেলার ছিন্নমূল মানুষের বসবাস ছিল। গত ৪০-৫০ বছর ধরে রূপনগর ঝিলপাড় বস্তিতে অনেকেই বসবাস করে আসছিলেন। এবারই প্রথম আগুনে এত বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হলেন তারা।

বস্তিতে বসবাসকারী গার্মেন্টস কর্মী আকলিমা আক্তার বলেন, ঈদের কারণে গ্রামের বাড়ি ভোলায় গিয়েছিলাম স্বামী সন্তানের সাথে। আগুনের খবর শুনে রাতেই গাড়িতে উঠে ঢাকায় আসি। কিন্তু এসে দেখি আমার ঘর কোনটা বোঝা বড় দায়। পুড়ে সব ছাই। এর মধ্যে পুড়ে যাওয়া লোহার খাট, ইস্টিলের আলমারি, হাড়ি-পাতিল যা কিছুটা ব্যবহার করার মতো তাই উদ্ধারের চেষ্টা করছি। তিনি কান্না করে বলেন, অনেক দিনের কষ্টের টাকায় গুছিয়েছিলাম সংসার। হঠাৎ আগুনে এভাবে সব পুড়ে ছাই হবে ভাবতে পারিনি।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তির ভেতরে ঢোকার মুখেই ধ্বংসস্তূপ থেকে অবশিষ্ট অংশটুকু ভ্যানে নিয়ে গলিতে দাঁড়িয়েছেন বরিশাল মেহেন্দিগঞ্জের আলমগীর মিয়া। পেশায় সুইপার আলমগীর কান্নাকাটি করে বলেন, সন্ধ্যায় কামে গেছি। আগুনে পুড়ছে সব খবরটাও পাই নাই। আইসা দেখি সব পুড়ে শেষ। ৩০ বছর ধরে এই বস্তিতে থাকছি। কখনো এমন করে আগুনে পুড়ে সব হারাই নাই। 

পুড়ে যাওয়া স্তূপের মধ্যে হাত লাগিয়ে একটার পর একটা টিন টেনে টেনে অবশিষ্টের খোঁজ করছেন পেশায় অটোরিকশা চালক সোহেল মিয়া। তিনি বলেন, রাত থেকে পেটে খাবার জোটেনি। সারা দিন পরিশ্রম করে যা ইনকাম তাতে খেয়ে থেকে চলে যেতে। কিন্তু আগুনে হারালো আশ্রয়, নেই খাবারের বন্দোবস্ত। এখন কোথায় থাকবো কোথায় খাবো জানি না। আমগো তো ঘরহারা, সহায়-সম্বলহীন মানুষের এ বস্তির ঘরই ছিল শেষ আশ্রয়। তাও শেষ।

বস্তির সাতটি ঘরের মালিক দুর্ঘটনায় পা হারানো শফিকুল ইসলাম বলেন, ১৫ বছর আগে এখানে এসে ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করি। ১৫শ‘ টাকা করে সাতটি ঘর ভাড়া দিয়েই আমার নিজের সংসার চলে। কিন্তু এই আগুনে ভাড়াটিয়াদের সাথে নিজেরও কিছু নেই, সব পুড়ে শেষ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অরুণ কান্তি শিকদার বলেছেন, আপনারা জানেন ৭টা ২২ মিনিটে আগুন লাগে। ৭টা ২৮ মিনিটে ফায়ার সার্ভিস আসছে। আগুনের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, মিরপুরের রূপনগরের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সুচিকিৎসা, আহার ও বাসস্থানসহ সবধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে। এ মুহূর্তে প্রথম কাজ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নাশকতা কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে কেউ আগুন লাগিয়ে নাশকতা করেছে, এমনটা মনে হচ্ছে না। মেয়র বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে এ বস্তিবাসীর জন্য বাউনিয়া বাঁধে ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছেন। তাদের সেখানে যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসা প্রদান করা অন্যতম কাজ। তাছাড়া যাদের ঘর-বাড়ি পুড়ে গেছে, তারা জানেন না এখন তারা কি খাবেন, কোথায় থাকবেন। ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর জন্য চিকিৎসা, আহার, বাসস্থান সব ধরনের সহযোগিতা করবে সিটি কর্পোরেশন। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ২৪টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে আহত হয়েছেন চারজন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *