আজকের রাজস্থান এবং সঙ্ঘ রাজনীতির বিবর্তন


গৌতম রায়
অতি সম্প্রতি রাজস্থান বিধানসভা তে মব লিঞ্চিং ও সম্মান হত্যা বিরোধী দুটি বিল গৃহীত হয়েছে ।আশা করা যায় অচিরেই বিলটি আইনে পরিণত হবে। এই আইন দুটিতেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠিন শাস্তি মূলক ব্যবস্থা সংস্থান রাখা হয়েছে। অপরাধীদের যাবৎ জীবন কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা সংস্থান এই আইন টিতে রাখা হয়েছে ।
সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির দ্বারা সংগঠিত মব লিঞ্চিং এবং সম্মান হত্যা রুখতে এই আইন দুটি নিঃসন্দেহে একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। রাজস্থান সরকারকে এই পদক্ষেপের জন্য অভিনন্দন জানাতেই হয়। রাজস্থানে কংগ্রেস পরিচালিত সরকার সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক হিংসা কে প্রলম্বিত করবার পরিকল্পনায় সংগঠিত মব লিঞ্চিং এবং সম্মান হত্যার বিরুদ্ধে যে দৃঢ় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ।
রাজস্থানে কংগ্রেস পরিচালিত সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির সামাজিক বিভাজন এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি’ সাম্প্রদায়িকতা’র প্রসারের লক্ষ্যে যাবতীয় চেষ্টার বিরুদ্ধে যে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেই আইনি পদক্ষেপ কেবলমাত্র রাজস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় সহ যে রাজ্যগুলিতে কংগ্রেস দল ক্ষমতায় রয়েছে ,সেই রাজ্যগুলিতে এই আইনটি অবিলম্বে চালু করা এবং সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সেই, সেই রাজ্যের সরকারগুলির সঠিক নজরদারি একান্ত প্রয়োজন।
এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে বলতে হয় যে , রাজস্থানে কয়েক মাস হল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাসীন হয়েও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশাসনিক দৃঢ়তায় মোকাবিলা করার জন্য যে আইন প্রণয়ন করলেন, গত ৮ বছরে সেই আইন প্রণয়নের কোন মতো সৎ সাহস পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার বা তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু দেখান নি।
গত ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে একাধিক মব লিঞ্চিং এর ঘটনা ঘটেছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে মব লিঞ্চিং এবং সম্মান রক্ষা জনিত হত্যা বিরোধী আইন একান্ত জরুরি। মুখে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন ।সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য নানা ধরনের আলংকারিক এবং লোকদেখানো পদক্ষেপের কথা তিনি বলেন। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োগের বিষয়ে তিনি যে আদৌ যত্নবান নন, তা খুব পরিষ্কার হয়ে গেল এ থেকেই যে, রাজস্থানে ক্ষমতায় আসবার অল্প কিছুদিনের ভিতর সেখানকার কংগ্রেস সরকার মব লিঞ্চিং বা সম্মান হত্যা বিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন করতে পারলেও ,পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এই ধরনের আইন প্রণয়নের কোনো চিন্তা ভাবনাই আজ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেন নি ।
কংগ্রেস দল পরিচালিত রাজস্থান সরকার এমন দুটি আইন তাঁদের রাজ্যে প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেই এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে নরম সাম্প্রদায়িকতার পথ থেকে কংগ্রেস দল সরে এসেছে ।আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ,অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে তিন দফায় প্রায় সাড়ে ছয় বছরের এন ডি এ নামক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোটের শাসন ক্ষমতার অবসানের পর, ২০০৪ সালে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইউ পি এ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের অব্যবহিত আগে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ডঃ মনমোহন সিং বলেছিলেন;
তাঁর সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় একটি কঠিন ,কঠোর আইন প্রবর্তন করবেন ।কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দু’দফায় ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেও সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় মনমোহন সিংয়ের সরকার কোনো রকম কঠিন, কঠোর আইন কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রণয়ন করেন নি ।
যদি মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউ পি এ সরকার সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় কোনোরকম কঠিন আইন প্রবর্তন করতেন , তাহলে হয়তো রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি আজ যে পর্যায়ে সংসদীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট কে অতিক্রম করে , ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটি প্রান্তের সামাজিক জীবন কে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে আকীর্ণ করে দিতে অনেকটাই সফল হয়েছে, এমনটা হয়তো সম্ভবপর হতো না ।
পাশাপাশি আরও একটি কথা বলতে হয় যে, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্বদের মূর্তি ভাঙ্গার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হিন্দুদের ভেতরে যে প্রতিযোগিতা আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্য করেছি ,যে প্রতিযোগিতার পরিমণ্ডল থেকে তাদের’ স্বাভাবিক মিত্র’ তথা’ প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’ র অন্যতম ধারক-বাহক তৃণমূল কংগ্রেস কোনো অবস্থাতেই মুক্ত নয় ,সেই প্রতিযোগিতার আসরে ই আমরা রাজস্থানের কিছু মানুষকে অবতীর্ণ হতে দেখলাম ।
সেখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি একদল দুর্বৃত্ত ভেঙে দিয়েছে ।অত্যন্ত এই নিন্দনীয় কাজ টির কিভাবে মোকাবিলা রাজস্থান সরকার করছে তা এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি। শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচক হয়েও এ কথা জোরের সঙ্গে বলতে হয় যে , তাঁর মূর্তি ভাঙ্গার ভেতরে কোনো মহত্ব বা কোনো কৃতিত্ব নেই ।
দরকার তিনি যে আত্মঘাতী চিন্তার প্রসার এবং প্রয়োগের লক্ষ্যে কাজ করে গেছিলেন, সেই চিন্তার কুফল সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে অবহিত করে সেই চিন্তার বেড়াজাল থেকে সাধারণ মানুষকে বের করে নিয়ে আসা। রাজস্থানে কংগ্রেস সরকার যে সে পথে না হেঁটে তাঁদের কর্মী সমর্থকদের বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্বদের মূর্তি ভাঙার সস্তার পথকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে রাজস্থানের কংগ্রেস সরকার যদি নিজেদের বের করে না আনতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁদের পক্ষেও বড় ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে এ কথা বললে মনে হয় না খুব ভুল বলা হবে।
উচ্চবর্ণের হিন্দু অভিজাত ‘শেখাওয়াতি’ যে ভাবধারার ভেতর দিয়ে আরএসএস তার রাজনৈতিক সংগঠন গুলির সাংগঠনিক এবং সামাজিক ভিত্তি রাজস্থানে স্থাপন করেছিল , সেই পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে তারা কিন্তু সময় উপযোগী অনেক অদলবদল ঘটিয়েছে। এটা কিন্তু মনে করার কোন কারণ নেই যে, উগ্র রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ,ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারার ধারক বাহক আরএসএস ,তাদের রাজনৈতিক সংগঠন কে দেশের সর্বত্র বিস্তারিত করবার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ,তাদের জন্মলগ্নের চিন্তা ভাবনাকে একদম গোড়া ভাবে ধরে রেখেছে।
আরএসএস কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ র প্রসার প্রচার ও প্রয়োগের লক্ষ্যে, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন কে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনায়, সময়ের নিরিখে নিজেদের চিন্তাভাবনায় মূল আদর্শগত ভিত্তি অক্ষুন্ন রেখে ,কৌশলগত প্রয়োগের দিকটিতে অনেক রকমের অদল বদল ঘটিয়েছে।
অটল বিহারী বাজপেয়ী ক্ষমতা য় থাকাকালীন রাজস্থানে তাঁদের দলীয় নেতা ভৈঁরো সিং শেখাওয়াতকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষবিন্দুতে এনে, তাঁকে উপ রাষ্ট্রপতি করে রাজস্থানের উচ্চবর্ণের শেখাওয়াতি সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দু চিন্তা-চেতনার যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে ছিলেন, আরএসএস বিজেপি সময়ের নিরিখে সেই চিন্তা চেতনার প্রয়োগ জনিত কৌশলের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে তাতে অনেক বিবর্তন ঘটিয়েছে।
সংঘ কিন্তু তাদের ভাবনা তে অনেক অদলবদল ঘটিয়েছে বিগত তিরিশ বছর ধরে। কৌশলগত প্রয়োগের দিক থেকে আরএসএসের চিন্তাভাবনায় যে ধরনের অদল বদল ঘটেছে তারই ফলশ্রুতি বলা যায় ২০১৪ সালে একক ঘনিষ্ঠতায় বিজেপির কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসে।২০১৯ সালে সেই ক্ষমতা কে প্রায় একই ভাবে ধরে রাখা ও সেই কৌশলগত বিবর্তনের ই একটি অঙ্গ।
গত ৩০ বছরে আরএসএসের চিন্তা-চেতনার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কৌশলগত পরিবর্তনের সবথেকে বড় প্রমাণ হলো , তাদের বিভিন্ন শাখা সংগঠন গুলির গোটা দেশ সময় ব্যপ্তি ।আরএসএসের শ্রমিক সংগঠন “ভারতীয় মজদুর সংঘ” এই মুহূর্তে গোটা দেশে অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন। এই সংগঠনটি বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনের গুলির মত শ্রমিকদের স্বার্থে কখনোই ব্যাপ্ত নয় ।
মালিকের স্বার্থ এবং শ্রমিক সমাজে হিন্দু মুসলমানের বিভাজন তৈরি করে মালিকের স্বার্থ সিদ্ধি , শ্রমিক পরিমন্ডলে যাতে কোনো অবস্থাতেই বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন গুলি সেভাবে দানা বাঁধে না পারে –তার জন্য সব রকম ভাবে যত্নবান হওয়া , এইসব লক্ষ্যেই এই ভারতীয় মজদুর সংঘ গত ৩০ বছর ধরে খানিকটা আরএসএসের ঢঙে নীরবে, নিভৃতে কাজ করে গেছে ।
এই কাজের ভেতর দিয়েই তারা জনসংঘ পরবর্তী বিজেপিকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে খানিকটা অলক্ষ্য থেকে সব রকম ভাবে সাহায্য করে গেছে। এক ই কথা প্রযোজ্য আর এস এস এর ছাত্র সংগঠন” অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ” এর সম্পর্কেও। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ,যাদের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রধান কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, তাদেরও সংঘের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে ঠেলে দেওয়ার লক্ষ্যে সব রকমের আত্মনিয়োগ কে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ।
এই ধরনের প্রায় ৩৬ টি শাখা সংগঠন এবং তাদের অন্তর্গত আরো কয়েকশো সহযোগী সংগঠন গত তিরিশ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য গুলি দিকে লক্ষ্য রেখে কাজ করে গেছে ।রাজস্থানের কিন্তু এভাবেই এইসব সংগঠনগুলি কার্যত প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি এড়িয়ে কাজ করে গেছে।
এই দিক থেকে বিচার করেই আমাদের দেখতে হবে সে রাজ্যে বর্তমান ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার মব লিঞ্চিং বা সম্মান হত্যা বিরোধী আইনের প্রণয়ন করলেও সেই আইনগুলির সঠিক যথাযথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা মানুষজন কতখানি আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয় ।কারন, গত ৩০ বছরের সামাজিক প্রযুক্তির ফলে রাজস্থানে আজ নানা রাজনৈতিক কারনে কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের উচ্চ স্তরের আমলা থেকে শুরু করে অত্যন্ত সাধারণ স্তরের কর্মীদের মধ্যেও রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী মানসিকতা জোরদারভাবে চেপে বসে আছে।
এই মানসিকতা সম্পন্ন সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আইন প্রণয়ন, এরপর সেই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা দেখানোর যে উদ্যোগ, রাজনৈতিক, সামাজিক সদিচ্ছা দরকার, তা নরম সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী কংগ্রেস পরিচালিত রাজস্থান সরকার কতখানি দেখাবেন এখন সেদিকেই গোটা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের সব থেকে বড় দৃষ্টি রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *