বাংলার সামাজিক আন্দোলনে মুজফফর আহমদের ভূমিকা


গৌতম রায়

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার(১৮৮৫) প্রথম কুড়ি বছর (১৮৮৫-১৯০৫) যে সময় কাল , তাকে জাতীয় কংগ্রেসের” আবেদন-নিবেদনের যুগ “বলা হয়। সেই সময় টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর, রাজনৈতিক আন্দোলন দুইটি ধারায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিতে শুরু করে ।
জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারা, যে ধারার সঙ্গে হিন্দু পুণরুত্থানবাদী চিন্তা চেতনা থেকে উদ্ভূত জাতীয়তাবাদের একটি ভূমিকা থাকলেও , সেই জাতীয়তাবাদী চিন্তার ভেতরে আজকে আরএসএস বা তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি যেভাবে বিকৃত অর্থে” রাষ্ট্রবাদ” নামক একটি আত্মঘাতী চিন্তাকে রোপন করার চেষ্টা করে ,সেই চিন্তা র কোনো সম্পর্ক ছিল না।আজ একাংশের রাজনীতিক জাতীয়তার যে বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করছে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম পর্বে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের ভেতরে তা কিন্তু আদৌ ছিল না ।
অপরপক্ষে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের জেরে ধীরে ধীরে সশস্ত্র বিপ্লববাদী চিন্তা-চেতনার ভেতর দিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের দ্বারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দের এইদেশ থেকে তাড়ানোর নানা ধরনের আয়োজন চলতে থাকে ।এসব রাজনৈতিক কার্যকলাপের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজন উনিশ শতকের নবজাগরণের সমাজ সংস্কারমূলক চেতনার জেরে, বিশ শতকের সূচনা পর্বে সাহিত্য-সংস্কৃতি কে ঘিরে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে সামাজিক সংস্কার এবং নব চেতনার উন্মেষ , ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই, সাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, সমন্বয়ী ভারতবর্ষের শাশ্বত ভাবনাকে মেলে ধরার দিকে দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করেছিল।
এ কাজে বাংলার উদীয়মান মধ্যবিত্ত ,আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত মুসলমান সমাজ অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিলেন। মুসলমান সমাজে আধুনিক শিক্ষার প্রসারের ইংরেজি , উর্দু ভাষার প্রতি অভিজাত সমাজের আকর্ষণ থাকলেও, আমজনতার ভাষা, ‘বাংলা’ কে সাধারণ মানুষদের ভেতরে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে এঁদের তেমন কোনো উৎসাহ ছিল না।
অভিজাত সমাজের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সারস্বত সমাজের আধুনিক চিন্তা ভাবনার সাথে মুসলমান সমাজকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক সংস্কারের দিকটিকে বেগবান করার প্রচেষ্টায় ১৯১১ সালে ৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি কলকাতার কলকাতার এন্টনি বাগানে মৌলভী আব্দুর রহমান খানের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় ।
১৮৬৩ সালে মহামেডান লিটারেরি সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটি কিন্তু ছিল অভিজাত মানুষদের সংগঠন ।১৮৮২মতান্তরে১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে খান বাহাদুর আবদুল আজিজ, মাওলানা মোঃ ওয়াদুল্লাহ আল ওয়াবদি, সাহিত্যিক মুন্সি মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ইত্যাদি রা মিলে তৈরি করেছিলেন” মুসলিম সুহৃদ সম্মিলনী “। নবাব আবদুল লতিফের এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।
পরবর্তীতে ১৩০৫ বা ১৩০৬ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য বিষয়ক সভা নামক আরো একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল। নবাব আলী চৌধুরী সেই সভার সভাপতি ছিলেন। যশোরে “যশোর-খুলনা সিদ্দিকিয়া সাহিত্য সমিতি” নামক একটি সংগঠনও মুসলমান সমাজের আধুনিকতার বিকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।হাবিব যবিবুর রহমান ছিলেন এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান।
” বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ” কে মুসলমান সমাজের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারা হিসেবে দেখানোর একটা প্রবণতা সেই সময়ই প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যক্তিত্বদের ভেতর থেকে উঠে এসেছিল। এ প্রসঙ্গে সমিতির প্রথম সম্পাদক ভাষাচার্য শহীদুল্লাহ বলেছিলেন;
আমরা কয়েকজন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য ছিলাম ।সেখানে হিন্দু-মুসলমানের কোন ভেদাভেদ না থাকলেও আমরা বড়লোক ঘরের গরীব আত্মীয়ের মতো মন মরা হয়ে সভায় যোগদান করতাম ।
আমাদের মনে হলো , বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে সম্বন্ধ বিলোপ না করেও আমাদের একটি নিজস্ব সাহিত্য সমিতি থাকা উচিত ।( এম আবদুর রহমানের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ইতিহাস ” নামক স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ)।
এই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সঙ্গে জন্ম লগ্ন থেকেই মুজাফফর আহমেদের ছিল একটি আত্মিক সম্পর্ক। মুজাফফর আহমেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজের সঙ্গে সংযোগ একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল ।সেই ভূমিকার ভিত্তি স্থাপনে মুসলমান সাহিত্য সমিতির বিশেষ উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
মুজফফর আহমেদের মীরাট ষড়যন্ত্র মামলাতে ঐতিহাসিক ভূমিকা, পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে সাম্যবাদী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদানের কথা বহুল আলোচিত হলেও বাংলার সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর অসামান্য অবদান নিয়ে সে ভাবে আলোচনা হয় না ই বললে চলে ।
বঙ্গীয় সাহিত্য মুসলমান সাহিত্য সমিতির মুখপত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মুজফফর আহমেদ যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন ,তা বিশ শতকে সূচনাপর্বে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে লড়াই করে, ধর্মীয় -সামাজিক – অর্থনৈতিক – সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে , একটি সুসংহত পরিবেশ নিজেদের জন্য রচনা করবার ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের যে ভূমিকা, সেই ভূমিকার পটভূমি নির্মাণে বিশেষ রকমের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।
এই সংগঠনের স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে মুজাফফর আহমেদ নিজে লিখছেন ;
বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় ও চতুর্থ দশকে কলিকাতার একটি সাহিত্য সংগঠনের নাম ছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ।আমিও এই সংগঠনটিকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সাহেব ছিলেন সমিতির সম্পাদক। তাঁর বাড়ি বাখরগঞ্জ জেলার ভোলা শহরের নিকটবর্তী চাফতা গ্রামে।
স্কুল সমূহের অবসরপ্রাপ্ত ইনস্পেক্টর মৌলভী আবদুল করিম সাহেব ছিলেন সমিতির সভাপতি। আমি ছিলাম সমিতির সহকারি সম্পাদক ।সমিতির একখানা ত্রৈমাসিক মুখপাত্র বের হয় ।নাম দেয়া হয়েছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ।
এই পত্রিকা যখন প্রথম বের হয় তখন ও সমিতির অফিস ছিল ১৪\১ মির্জাপুর স্ট্রিটের নিচের তলার একটি ঘর। সমিতির কাজ বেড়ে যাওয়ায় এবং তার উপরে পত্রিকা খানা বের হওয়ার এই এক খানা ঘরে আর জায়গা কুলোচ্ছিল ছিল না ।আমরা তখন বড় জায়গায় উঠে যাবার চেষ্টা করতে থাকি, এবং ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের দোতলায় রাস্তার দিকের অংশে বেশ য বড় জায়গা পেয়েও যাই।
এটা ১৯১৮ সালের শেষার্ধে কোন এক মাসের কথা ।এই সময় আমি সমিতির সব সময়ের এর কর্মী হওয়ার আগে কবি শাহাদাৎ হোসেন এবং পাবনার আবু লোহানী সামান্য অ্যালাউন্স নিয়ে কিছুদিন সমিতির অফিসে কাজ করেছিলাম ।১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হতে আমি সমিতির বাড়িতে থাকা আরম্ভ করি। মোঃ শহিদুল্লাহ সাহেব ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ছিলেন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক।( নজরুল স্মৃতি) [ পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৮ সালের এপ্রিল- মে মাসে]।
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার পর সময় কালে শহিদুল্লাহ সাহেব বসিরহাট ওকালতি পেশায় নিযুক্ত ছিলেন ।বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার ১৩২৫ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় মুজাফফর আহমেদ লিখছেন;
পত্রিকা সম্পাদনার কাজে ওকালতি পেশা ছেড়ে শহীদুল্লাহ সাহেব স্থায়ীভাবে বসিরহাট ত্যাগ করে কলকাতাতে চলে এসেছিলেন।
শহীদুল্লাহের জীবনী কারেরা তাঁর ওকালতি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসার পেছনে স্যার আশুতোষের ভূমিকার যে কথা বলেন ,মুজাফফর আহমেদের সাক্ষ্য কিন্তু সে কথা বলছে না।
মুজাফফর আহমেদ লিখছেন;
সেই সময় তিনি কিছুদিন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির বাড়িতে আমার সঙ্গে একই ঘরে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পরে, তিনি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অনুরোধে সেই বিশ্ববিদ্যালয় চলে যান(ঐ)।
দেশভাগের পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা ঘিরে যে বিতর্কের অবতারণা হয়েছিল , সেই বিতর্ক কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজে বিশ শতকের সূচনাপর্বে, আধুনিকতার বিকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রকট হতে উঠতে শুরু করেছিল ।পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার লক্ষ্যে যে সম্মিলিত চেতনার বিকাশ ঘটেছিল দেশভাগের পর বাংলাদেশে, সেই চেতনার সলতে নির্মাণের কাজে মুজফফর আহমদ এবং তাঁর আত্মার আত্মীয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র একটি বিশেষ ভূমিকা এবং অবদান রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মুজফফর আহমেদ নিজেই লিখছেন;
বিংশ শতাব্দীর প্রথমে বাঙালি মুসলমান একটা বড় রকমের দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে। তন্মধ্যে একটি ছিল মাতৃভাষা সমস্যা। অভিজাত বাঙালিরা উর্দু কে প্রাধান্য দিয়েছিলেন মাতৃভাষা হিসেবে ।
অতঃপর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নারী শিক্ষা প্রভৃতি চিন্তাজগতের উপরে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে এই দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যে থেকে বেছে নিতে তার কিছু সময় লেগেছিল।( বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা,মাঘ, ১৩২৫ বঙ্গাব্দ)।
এই পর্বটি সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পেয়েছিল মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সম্পাদিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় এই পত্রিকায়।যে পত্রিকার নেপথ্য কারিগর ছিলেন মুজফফর আহমদ।
পবিত্র ইসলামের ঐতিহ্য এবং ইতিহাস সম্বন্ধে কোনো অশ্রদ্ধা বা অনাগ্রহ কখনো প্রকাশিত হয়নি পত্রিকাতে। কিন্তু ধর্মীয় আবেগ জনিত চিন্তা-চেতনার থেকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল ইসলামের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের মানবীয় রূপকে ।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে কেন্দ্র করে” মুসলিম সাহিত্য সমাজ” ও “শিখা” ( ১৯২৭ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত এঁদের কার্যক্রম সক্রিয় ছিল) গোষ্ঠী বাংলায় যে দ্বিতীয় জাগরণের সূচনা করে ,সেই জাগরণের সলতে পাকানোর কাজটি করেছিল এই” বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা”। আর এই কাজে বাঙালি সমাজের এক অনন্যসাধারণ সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন মুজাফফর আহমেদ।
বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কে ঘিরে বিতর্ক শুরুর অনেক আগে মুজফফর আহমেদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ‘বাংলার মানুষদের মাতৃভাষার সমাধানে যে ভূমিকা পালন করেছিল তাকে এককথায় ঐতিহাসিক বলতে হয়। মুজফফর আহমেদের তত্ত্বাবধানেই ওই পত্রিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষাতে ১৯১৮ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যবর্তী সময় কালে প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় দ্বিধাহীনভাবে, মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিল যে ;
বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা ইহা দিনের আলোর মতো সত্য। ভারতব্যাপী জাতীয়তা সৃষ্টির অনুরোধ বাংলাদেশ উর্দু চালাবার প্রয়োজন যতই হোক না কেন, সে চেষ্টা আকাশে ঘর বাঁধার মতো নিষ্ফল ।
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে ডঃ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন;
পৃথিবীর ইতিহাস আলোচনা করিয়া দেখো, মাতৃভাষার উন্নতি ব্যতীত কোন জাতি কখনো কি বড় হইতে পারিয়াছেন ? আরব পারস্য কে জয় করিয়া ছিল ।পারস্য আরবের ধর্মের নিকট মাথা নত করিয়াছিল, আরবের ভাষা লয় নাই ।
ডঃ শহিদুল্লাহ তাঁর বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় অত্যন্ত সব কৃতজ্ঞচিত্তে সেদিনের সেই ভাষণ দেওয়ার প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে মুজফফর আহমেদের স্বপ্রশংসা বন্ধুত্বের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন( শহীদুল্লাহ রচনাবলী- সম্পাদনা- আনিসুজ্জামান।বাংলা একাদেমি।ঢাকা।)।
সমিতির পরবর্তী একটি অধিবেশনে মুজফফর আহমদে এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে শহীদুল্লাহ বলেছিলেন ;
অনেকদিন পূর্বে উর্দু বনাম বাংলা মোকদ্দমা বাংলার মুসলমান সমাজের ভেতর উঠিয়াছিল, তাহাতে বাংলার ডিক্রি হইয়া যায়। বর্তমানে আবার সেই মোকদ্দমার ছানি বিচারের জন্য উর্দু পক্ষ কে সওয়াল জবাব করতে শুনিতেছি।দখল বাংলার ই থাকিবে। তবে উর্দু বাংলার অধীনে উপযুক্ত করে ইচ্ছাধীন প্রজা স্বত্ত্বে কিছু বন্দোবস্ত পাইতে পারে ।
পরবর্তী সময়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের দ্বারা মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশের ভেতরে পাকিস্তান ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠায় সেই ভাবনার শরিক হয়েছিলেন মওলানা মুহাম্মদ আকরাম খাঁ। তিনি ও কিন্তু তাঁর প্রথম জীবনে মুজফফর আহমদের সঙ্গে বন্ধুত্বের দৌলতে এই বাঙালি, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির মুখের ভাষা যে বাংলা হওয়া উচিত ,তার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন( সমস্যা ও সমাধান- মওলানা আকরম খাঁ)।
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার তৃতীয় সম্মেলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসেবে মওলানা আকরাম খাঁ বলেছিলেন ;
দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত প্রশ্ন আছে ।বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কি উর্দু না বাংলা এ প্রশ্নটা তাহার মধ্যে সর্বপেক্ষা অদ্ভুত ।নারিকেল গাছে নারিকেল ফলিবে , না বেল? এই প্রশ্নটা তাহার মধ্যে সর্বেপেক্ষা অদ্ভূত।
বঙ্গে মোছলেম ইতিহাসের সূচনা হতে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় তাহাদের লেখ্য ও মাতৃ ভাষায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও মাতৃভাষা রূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছেএবং ভবিষৎতেও মাতৃভাষা রূপে ব্যবহৃত হইবে।
এই চেতনায় স্থিত থাকবার ক্ষেত্রে মুজাফফর আহমেদ যে তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় তা মুক্তকণ্ঠে মাওলানা আকরাম খাঁ স্বীকার করে গেছেন(ঐ)।
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা সম্পর্কে নজরুল লিখেছেন ;
এই সংগঠনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বহু দিনের ।কয়েকজন বন্ধুর আহ্বানে আমি বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির আড্ডায় আশ্রয় নিই। এখানে আমি বন্ধুরূপে পাইবার মুজফফর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রমুখ বন্ধুগণকে। আমাদের আড্ডা ছিল সত্যিকার জীবন্ত মানুষের আড্ডা। আমরা তথাকথিত’ য়্যারিষ্ট ক্রাট’ বা আড়ষ্ঠ কাক ছিলাম না।
বোমারু বারীনদা সে একদিন আমাদের আড্ডা দেখে বলেছিল ,(বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ভাই বারীন ঘোষের সঙ্গে মুজফফর আহমদের সংযোগের ঘনিষ্ট যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই বাড়িটি ) হ্যাঁ আড্ডা বটে।
আজকালকার তরুণেরা যে নীড় সৃষ্টি করে বসে আছে, তা আমরা করিনি। আমরা জীবনকে করেছিলাম উপভোগ। যাক! সেদিন যদি সাহিত্য সমিতি আমাদের আশ্রয় না দিত , তবে হয়তো কোথায় আমি ভেসে যেতাম, তা আমি জানিনা ।এই ভালোবাসার বন্ধনেই আমি প্রথম নীড় বেঁধেছিলাম। এ আশ্রয় না পেলে আমার কবি হওয়া সম্ভব হতো কিনা আমার জানা নেই। সাহিত্য সমিতি কে বাঁচিয়ে রাখতে একে সর্বপ্রকার সাহায্য করতে বিশেষভাবে অর্থ সাহায্যপুষ্ট করে তুলতে সমাজকে আবেদন জানাচ্ছি। সাহিত্য সমিতি বিত্তশালী হলে বহু তরুণ প্রতিভা বিকাশের সহায়তা করতে পারবে।( সমিতির সভাপতি হিসেবে একটি সভায় নজরুলের এই বক্তৃতা করেছিলেন।আবদুর কাদির সম্পাদিত ‘ নজরুল রচনা সম্ভারে’ এই বক্তৃতাটি সঙ্কলিত আছে)।
মুজাফফর আহমদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ‘৫ বছরের সময় কালে ২২ টি সংখ্যা বের করেছিল। এই সংখ্যা গুলি বের করবার পর সমিতির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়ে ।সাড়ে তিনশ টাকার দেনার দায়ে সমিতির সমস্ত বই পত্র ,আসবাব ক্রোক হয়ে যায় ক্রুক হওয়ার উপক্রম হয় মাত্র ৩ দিনের নোটিশে।
পরবর্তীতে গোটা ঘটনাটি ফজলুল হকের কর্ণগোচর হয় ।তাঁর মধ্যস্থতায় সমিতি রক্ষা পায়। এই সমিতির কার্যাবলী তে বলে বলা হয়েছিল ;
বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে বঙ্গ সাহিত্যের আলোচনা ও তার পুষ্টিবিধান ।
আরবি ফারসি উর্দু প্রভৃতি ভাষার ধর্মগ্রন্থ ইতিহাস গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রচার ।
প্রাচীন মুসলমান বঙ্গসাহিত্যের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।
বঙ্গ দেশের বিভিন্ন জেলার পীর মহাপুরুষ ও অন্যান্য মহাজন জীবনী সংগ্রহ প্রকাশ( এটি সমন্বয়ী চেতনা বিকাশে একটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে)।
বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের প্রাচীন এবং সাবলীল ও প্রাচীন কীর্তিকলাপের ইতিবৃত্ত ও জাতীয় ইতিহাসের অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ ।
বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের সাময়িক পত্রিকা প্রচার।
সদ গ্রন্থের প্রকাশ।
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সাহিত্যসেবী দিগকে উৎসাহ প্রদান।
সাহিত্য ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন ।
সমিতির একটি নিজস্ব পাঠাগার স্থাপন এবং উক্ত পাঠাগার সংরক্ষণ।
সমিতির প্রথম অধিবেশন কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ।দ্বিতীয় অধিবেশন হয় ১৯১৭ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে।
এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ।তৃতীয় অধিবেশন হয় চট্টগ্রামে।সেখানে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সভাপতিত্ব করেন এবং অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হয়েছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ।
সমিতির উদ্যোগে মুসলিম শিক্ষা নিয়ে একটি অধিবেশন ওই একই সভা মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমিনুর রহমান সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন খান বাহাদুর আবদুল আজিজ।
১৯২১ সালের ৮ ও ৮ ই এপ্রিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অধিবেশন বসে ২৪ পরগনার বসিরহাটে।
সাংবাদিক , সাহিত্যিক মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সেখানে সভাপতিত্ব করেছিলেন। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন মওলানা মুহাম্মদ আকরাম আলী।
পঞ্চম অধিবেশন ১৯৩২ সালে অনুষ্ঠিত হয় তদানীন্তন অ্যালবার্ট হল, আজকের কফি হাউসে ।এই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন মহাকবি কায়কোবাদ ।সাহিত্য শাখা সভাপতি ছিলেন মনীষী কাজী আবদুল ওদুদ। ইতিহাস , বিজ্ঞান , দর্শন শাখাগুলিতে সভাপতিত্ব করেছিলেন জহুরুল হক, বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী কুদরাত-ই-খুদা, কাজিম উদ্দিন ।
এই অধিবেশনের উদ্বোধক ছিলেন কাজী নজরুল ।এই সভায় বিশেষভাবে আমন্ত্রিত ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। সভার ভিতরেই মহাকবি কায়কোবাদ তাঁর নিজের গলার বরণমালা খুলে , নিজের হাতে কাজী নজরুলকে পরিয়ে দিয়েছিলেন ।গভীর আবেগের সঙ্গে আলিঙ্গন করেছিলেন নজরুলকে।
এই সময়কালে নজরুল রচনা করেছিলেন ;
আচ্ছা মা ! তুমি বি এ পাশ করা ছেলের জননী হতে চাও , না বীর মাতা হতে চাও?….. কাকে বুঝাই যে লক্ষ পতি হয়ে ১০ হাজার টাকা বিলিয়ে দিলে তাকে ত্যাগ বলে না, সে হচ্ছে দান।
যে নিজেকে সম্পূর্ণ যুক্ত করে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে না পারল, সে তো তাই নয় ।………
এই তো সেই সত্যি কারের মোসলেম জননী, যিনি নিজের হাতে নিজের একমাত্র সন্তানকে যুদ্ধ সাজে সাজিয়ে জন্মভূমির পায়ে রক্ত ঢালতে পাঠাতেন।
এ বিসর্জন না অর্জন ?( এই রচনাগুলি নজরুরের ” রিক্তের বসন” গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত)।
এসব কর্ম কান্ডের নেপথ্য কারিগর ছিলেন মুজফফর আহমেদ। বাংলার সামাজিক জীবনে হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত স্রোত যে ব্রিটিশ ও ঔপনিবেশিকতার কড়াল গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করে আলোর পথে গোটা ভারতবর্ষকে টেনে নিয়ে যাবে ,তার ভিত্তি নির্মাণে মুজফফর আহমদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই সামাজিক আন্দোলন আমাদের অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *