বিগত লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের নরম সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে


গৌতম রায়

সদ্য সমাপ্ত সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ৫ টি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রায় ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। অভূতপূর্ব সাফল্য আসে কংগ্রেসের। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার অব্যবহিত পরেই সংবাদমাধ্যমের একটা অংশে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভবিষ্যৎ ঘিরে খানিকটা সংশয় পর্যন্ত প্রকাশ করা হতে থাকে।
অ বাম বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ওই পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে এমন কিছু আশা ও কষ্টকল্পনা জন্মাতে শুরু করে যার পরিপ্রেক্ষিতে অ বাম অ বিজেপি দলগুলির ভিতরে এক ধরনের আত্মতুষ্টির মনোভাব খানিকটা হলেও গড়ে উঠেছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। ওই পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে কংগ্রেসের প্রচার কৌশল গুলি যদি আমরা একবার মনে করার চেষ্টা করি ,তাহলে দেখতে পাব যে ,আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেস কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে নরম হিন্দু সাম্প্রদায়িক পথটিকে সব থেকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিল ।
এখন সেই পথের পথিক হয়েই কংগ্রেসের গত ডিসেম্বরে ওই পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সিংহভাগ সাফল্য এসেছিল ,নাকি সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যর্থতা ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে ওই ফলাফল– তা নিয়ে বিতর্কে র অবকাশ আছে।
তবে রাজস্থানে কংগ্রেসের গত ডিসেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনের সাফল্যের পেছনে বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন কৃষক আন্দোলন যে একটি বিশেষ ভূমিকা এবং অবদান রেখেছিল তা নিয়ে কোনো বিতর্কে অবকাশ নেই ।রাহুল গান্ধীর মত কংগ্রেস নেতা ও ওই নির্বাচনের অব্যবহিত পরে বামপন্থীদের ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞতা সহকারে স্মরণ করে ছিলেন।
গত ডিসেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনের এই সাফল্য অ বিজেপি অ বাম বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি কেন ধরে রাখতে পারল না ?সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী দলগুলির নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যর্থতার সব থেকে বড় কারণ হল ;গত ডিসেম্বরের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষিতে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মে পর্যন্ত, অর্থাৎ ;লোকসভা নির্বাচনের সময় কাল পর্যন্ত ,আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ও তাদের বিভিন্ন ধরনের শাখা সংগঠন গুলি যে ভয়াবহ সামাজিক প্রযুক্তি গোটা দেশব্যাপী চালিয়েছে, সেই সামাজিক প্রযুক্তির মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রায় সার্বিকভাবে সমস্ত বিরোধী দলগুলি ই ব্যর্থ হয়েছে ।
উগ্র ধর্মান্ধতা, উগ্র মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ,সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক চেতনার মোকাবিলায় নরম মৌলবাদ ,মোলায়েম ধর্মান্ধতা ,আর মৃদু সাম্প্রদায়িকতা যে বিকল্প হতে পারে না –এই বোধটা বিগত লোকসভা নির্বাচনে অ বিজেপি কোন বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই যেমন পোষণ করে নি। তেমনি সেই বোধকে তাঁদের নির্বাচনী সংগ্রামের প্রচার পর্বে ও তুলে ধরেনি। ফলে বিজেপি যে ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুকরণ ঘটিয়েছে ,সেই মেরুকরণের মোকাবিলায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বা অন্যান্য বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বিভিন্ন মন্দির মসজিদে গিয়েছেন।
সেখানে নানা ধরনের ধর্মীয় পোশাক ব্যবহার করেছেন। প্রকাশ্যে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করেছেন। সেগুলি বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম, সংবাদপত্র এবং সামাজিক গণমাধ্যমের ভিতর দিয়ে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কোন অবস্থাতেই আরএসএস — বিজেপির যাবতীয় উগ্রতার সঠিক জবাব হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি ।
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আরএসএস — বিজেপি– প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সহ তাঁর মন্ত্রিসভা এবং দলীয় সতীর্থরা যখন আক্রমনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু কে ,তখন তাঁর বংশধর রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিভিন্ন মন্দির মসজিদে ধর্মীয় রীতি নীতি পালনের ভেতর দিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের ভেতরে গড়ে তুলেছিলেন ,তা আর যাই হোক ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত নেহেরু র আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রের সঙ্গে সাযুজ্য পূর্ণ ছিল না মানুষ ।
যে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে বিগত পাঁচ বছর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সামাজিক প্রযুক্তির দ্বারা গোটা ভারতের একটা বড়ো অংশের মানুষ উগ্রতার দিকে ঝুঁকছে, সেটাকে সঠিক রাজনৈতিক মেধার দ্বারা অনুধাবন করে, তার মোকাবিলায় যথার্থ রাজনৈতিক পদক্ষেপ ,ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হাঁটা রাহুল গান্ধীর পক্ষে সম্ভবপর হয়নি।
বিজেপির মোকাবিলা যে ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থার প্রথাগত রাজনীতির পথে চলা, অর্থাৎ ;কেবল বিবৃতি বা পাল্টা বিবৃতির দ্বারা করা সম্ভব নয়, তাদের পেছনে আরএসএস নামক একটি ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী ,উগ্র ধর্মান্ধ, মৌলবাদী শক্তি মূল মস্তিষ্ক হিসেবে আছে –এটা অন্তর থেকে উপলব্ধি করে ,সেই ভাবে গোটা রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ভাতর দিয়ে নির্বাচনী সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার মতন বুদ্ধিমত্তা সদ্যসমাপ্ত সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস সহ কোন অ বাম বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই দেখাতে পারেননি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আরএসএস বিজেপির গোপন বন্ধুদের কথা আলোচনা করবার এই প্রেক্ষিতে কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। কারণ ,ওঁদের প্রতিটি পদক্ষেপই তাঁদের দলের জন্মলগ্ন থেকে আর এস এস ও তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সাহায্য করে এসেছে। কংগ্রেস বা রাষ্ট্রীয় জনতা দল বা সমাজবাদী পার্টি বা বহু জন সমাজ পার্টি কিংবা ডি এম কে অথবা এআইএডিএমকে র মতো কোন দলই বিজেপির মূল চালিকাশক্তি আরএসএসের সাম্প্রদায়িক অভিমুখের মোকাবিলায় যথার্থ ধর্ম নিরপেক্ষ অবস্থান সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের প্রচার পর্বে নিতে পারেননি ।
এই ক্ষেত্রে বামপন্থীদের যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানটি সাধারণ মানুষদের এক ধরনের সংশয় তিমিরে এসব অবিজেপি বুর্জোয়া দলগুলির দৌলতে। এই অবস্থা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ অ বিজেপির রাজনৈতিক দলগুলির নরম সাম্প্রদায়িকতা ,নরম মৌলবাদ প্রকারান্তরে বামপন্থীদের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের বদলে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদেরকে নাস্তিক হিসেবেই তুলে ধরবার একটা প্রবণতা প্রকট করে তুলেছে।
বামপন্থীরা সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে রুটি-রুজির লড়াই য়ের প্রশ্ন টিকেই কে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।’ রাম রাজ্য’ নয়,’ ঘাম রাজ্য’ কে সবথেকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সেই বিষয়গুলি উগ্র সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের প্রচার বনাম নরম সাম্প্রদায়িক নরম ধর্মান্ধ, নরম মৌলবাদী, আর ধর্মের রাজনৈতিক কারবারিদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার নিরিখে সাধারণ মানুষের কাছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাপা পড়ে গেছে ।
আরএসএস- বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা ,ধর্মান্ধতা মোকাবিলায় ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ভিন্নতর কৌশল অবলম্বন করে, নরম সাম্প্রদায়িকতার পথে হেঁটে ,সে অর্থে কোনরকম নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করতে না পেরে কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে রাহুল গান্ধী এখন পদত্যাগের প্রশ্নে তাঁর তথাকথিত’ দৃঢ় ‘অবস্থান নিয়ে এক ধরনের সহানুভূতির হাওয়া তাঁর নিজের দলের মধ্যে তৈরিতে সচেষ্ট।
রাহুলের এই কৌশল নিজের দলের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপনের লক্ষ্যে তাঁর পিতামহী ইন্দিরা গান্ধীর একাধিক কৌশলের সঙ্গে প্রকারান্তে তুলনা করা যেতে পারে। রাহুল কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফায় অনড় থাকায় কংগ্রেসের ভিতরকার তথাকথিত ইয়ং ব্রিগেড কার্যত আগে ,’কে বা প্রাণ করিবেক দান তারই লাগি কাড়াকাড়ি ‘ফেলে দিয়েছেন ।তাঁরা একযোগে ইস্তফা দিচ্ছেন ।কোনো কোনো মহল থেকে শোনা যাচ্ছে ,বয়ঃ ভারে নুব্জ,নবতিপর মতিলাল ভোরাকে নাকি কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি করা হতে পারে।
প্রশ্ন হল এই সব টোটকার ভেতর দিয়ে নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসবার পর বিজেপির যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক এবং অর্থনৈতিক আগ্রাসন, তার মোকাবিলা কি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে করা সম্ভবপর হবে? কংগ্রেস সভাপতির পদটি তে রাহুল থাকবেন কি থাকবেন না — এই প্রশ্নের থেকেও বিরোধী দল হিসেবে সংসদে সবথেকে বেশি আসনে অধিষ্ঠিত কংগ্রেসের পক্ষে কি জরুরি ছিল না অর্থমন্ত্রী নির্মালা সীতারামনের পেশ করা এই ভয়ঙ্কর জনবিরোধী বাজেটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরীর চেষ্টা করা?
এই ক্ষেত্রে অনেকের কাছেই এই প্রশ্ন তীব্র হয়ে উঠবে যে, পি ভি নরসিংহ রাও দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং বাজার অর্থনীতির যে প্রচলন করেছিলেন, সেইই পথটি ই আরো নির্মলা আরো উগ্রভাবে অনুসরণ করেছেন।সেই পথেই যে বাজেট নরেন্দ্র মোদির অর্থমন্ত্রী হিসিবে নির্মালা সীতারমন পেশ করলেন, সেই বাজেটের বিরোধিতা করার নৈতিক অধিকার কতখানি কংগ্রেস দলের পক্ষে আছে? কারণ; যে কৃষকের সমস্যার কে পুঁজি করে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়ে গত ডিসেম্বরে(‘১৮) কংগ্রেস দল ক্ষমতাসীন হয়েছিল, সেই রাজ্যগুলিতে কৃষি ব্যবস্থার সংকট এবং কৃষকের অবর্ণনীয় দুর্দশার নিরসনে বাজার অর্থনীতির পথ থেকে সরে এসে, বিকল্প কোন অর্থনীতির পথে কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই রাজ্য গুলির কংগ্রেস সরকার হাঁটেনি।
ওইসব রাজ্যগুলিতে আজও বিগত বিজেপি সরকারের মতই ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। সে সব খবর কখনো সংবাদ মাধ্যমে আসছে। কখনো আসছে না ।কিন্তু ঐসব রাজ্যগুলিতে যে কৃষকেরা ভালো নেই– সে কথা সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির আঞ্চলিক সংবাদ মাধ্যম এবং সর্বভারতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমের দিকে নজর দিলে খুব ভালো ভাবে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে ।
এহেন পরিস্থিতিতে রাহুল দলের সভাপতি থাকবেন, কি থাকবেন না, দলের সভাপতি থাকলে তিনি কতদিন দেশে অবস্থান করবেন, কিংবা কত দিন বিদেশে ছুটি কাটাতে যাবেন– এইসব’ তৈলাধার পাত্র ,না পাত্রাধার তৈলে’ র আলোচনার আদৌ কোন রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা আছে ?তার থেকে কি জরুরি নয়, আরএসএস – বিজেপি সর্বনাশা অর্থনৈতিক নীতি এবং সাম্প্রদায়িক অভিমুখের বিরুদ্ধে গোটা দেশ ব্যাপী সর্বতোমুখী আপোষহীন ধর্মনিরপেক্ষ গণ সংগ্রাম গড়ে তোলা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *