দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিজেপির কৌশল


গৌতম রায়

গুজরাট গণহত্যা নায়ক নরেন্দ্র মোদী যখন ২০১৪ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন তখন অনেকের ধারণা হয়েছিল ,সেই গণহত্যার নাটকীয়তা এবার গোটা দেশের একটি স্বাভাবিক চলচ্চিত্রে পরিণত হবে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ধর্মীয় বিভাজনের পথে হেঁটে, বিজেপির পক্ষে মেরুকরণ তীব্র করে, সেই দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০১৪ সালে আরএসএসের প্রত্যক্ষ মদতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যদি সেই পথে তিনি
পরিপূর্ণভাবে হাঁটতেন ,তাহলে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এই তথাকথিত সাফল্যকে তিনি কতটা ধরে রাখতে পারতেন– তা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের ভেতরেই যথেষ্ট সংশয় ছিল।
তাই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর ,একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা সুযোগ নিয়ে বিজেপি বা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গো রক্ষা ,লাভ জিহাদ ,ঘর ওয়াপসি,পুনঃ ধর্মান্তরিতকরণ ইত্যাদি রাজনৈতিক হিন্দুত্বের উগ্রতার প্রত্যক্ষ এজেন্ডা গুলি প্রয়োগ করার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান সমাজকে একটা ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে দাঁড় করিয়ে তাঁদের দুর্বিষহ অর্থনৈতিক সংকটের ভেতরে ঠেলে দেওয়া কেই নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘সাম্প্রদায়িকতা’র প্রয়োগ এবং প্রসারের ক্ষেত্রে সব থেকে বড় হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ।
এই লক্ষ্যেই উত্তরপ্রদেশের কইরানা কে কেন্দ্র করে নয়া হিন্দুত্বের গবেষণাগার হিসেবে মুসলমান সমাজের উপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবরোধের পরিবেশ তৈরি করেছিল গোটা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী শিবির সেই সময়ে।
নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম দফায় উত্তরপ্রদেশের কইরানাতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করে, তাঁদের ভাতে মারার যে কৌশল আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি নিয়েছিল, গুজরাট গণহত্যার পরবর্তী পর্যায়ে সেই কৌশলকে কি ভাবে রাজনৈতিক হিন্দুদের নয়া গবেষণাগার হিসেবে পরিণত করা যায় সেটাই ছিল মোদির দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর প্রথম এবং প্রধান টার্গেট।
নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর একদিকে ঝাড়খণ্ডের তবরিজ আনসারী মত সাধারণ, নিম্নবিত্তের মুসলমান সহ নাগরিকের উপর নির্মম অত্যাচার ও হত্যা, অপরদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপির রাজনৈতিক স্লোগান’ জয় শ্রীরাম’ কে ঘিরে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর ভয়াবহ সামাজিক মানসিক নির্যাতন দেশের আপামর মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ দের যে আতঙ্কের ভূগোলের দিকে ঠেলে দিয়েছে তার ই পথ ধরে বিজেপি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের এই ভয়াবহ পথে হাঁটবার সুযোগ পেয়েছে।
দেশকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার দিকে এগোতে এভাবেই শুরু করেছে রাজনৈতিক হিন্দুরা।
দুঃখের কথা ,পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কার্যকলাপ, বিশেষ করে তাঁর ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’র ফলশ্রুতিতে খোদ কলকাতার পার্ক সার্কাসে বিজেপির রাজনৈতিক স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম ‘না বলায় চলন্ত ট্রেনের ভেতরে শিক্ষকের ওপর ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ শহরতলির ঢাকুরিয়া থেকে পাক সার্কাস স্টেশনের ভেতরে চলন্ত ট্রেনে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের উপরে বিজেপির এই রাজনৈতিক স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম ‘কে ঘিরে যে ধরনের সামাজিক এবং শারীরিক অত্যাচার হয়েছে, তাতে বহু মানুষেরই অনুমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপ্রদেশে পর্যবসিত হতে আর বেশি দেরি নেই ।
সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন ঘটে যাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে যে ১৮ টি আসনে বি জে পি জয় লাভ করেছে, তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপরে এক ধরনের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করবার চেষ্টা করে চলেছে বিজেপি ।আর বিজেপির এই অপচেষ্টার মোকাবিলার নাম করে ওইসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া ,প্রথাগত শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের নগ্ন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদে যেভাবে ব্যবহার করছে তাতে শেষপর্যন্ত লাভটা হচ্ছে ওই রাজনৈতিক হিন্দুদেরই।
জাতীয় স্তরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের অন্ধকার থেকে আলোর অভিমুখে নিয়ে আসবার জন্য আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিজ্ঞানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইত্যাদি র প্রয়োগের পরিবর্তে বিজেপি বিশ্বাস করে ধর্মের ভিত্তিতে ওই সব মানুষদের ভেতরে এমন একটা চিন্তা চেতনার প্রসার ,যার দ্বারা সেই অংশের মানুষ কোন অবস্থাতেই আধুনিকতার দিকে নিজেদের চিন্তা শক্তিকে প্রসারিত করতে না পারে ।এই উদ্দেশ্য নিয়েই একদিকে নিজেদের শাখা সংগঠন ‘বনবাসী কল্যাণ আশ্রম ‘এর মধ্য দিয়ে বিজেপি আদিবাসী ,তপশিলি জাতি- তপশিলী উপজাতি ভুক্ত মানুষদের বর্ণহিন্দুত্বে উপনীত হওয়ার দুর্দান্ত লোভ দেখিয়ে তাঁদের কে ব্যবহার করছে।
নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির’ সাম্প্রদায়িকতা’র প্রচার, প্রসার এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরএসএস বা তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির আদর্শগত অবস্থানে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী স্বার্থ, বর্ণাশ্রম বাদী স্বার্থের –বাইরে দলিত ,পিছড়ে বর্গ, আদিবাসী ,তপশিলি জাতি- উপজাতি— কোন স্বার্থের ঠাঁই নেই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে।
যদিও এই অংশের মানুষদের মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ক্ষেপানোর জন্য বিশেষভাবে দরকার বিজেপির ।তাই তারা ‘শান্তিকুঞ্জ হরিদ্বার’ ইত্যাদির মত নিজেদের শাখা সংগঠনের মাধ্যমে ওইসব পিছিয়ে পড়া মানুষদের একটা লোক দেখানো সামাজিক উত্তরণের ব্যবস্থা করে থাকে। রাজনৈতিক স্বার্থে এই পিছড়ে বর্গের সামাজিক উত্তরণের চেষ্টা করলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সেই সব মানুষদের আদৌ নিম্নতম সম্মান বা মর্যাদা রাজনৈতিক হিন্দুরা দেয় না।
ঠিক একইভাবে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এখানকার সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায় কে নিজের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করবার তাগিদে তাঁদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক জাগরণের বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রতিক্রিয়াশীলতার আবর্তেই তাঁদেরকে নিমজ্জিত করে রাখবার জন্য নানা ধরনের প্রচেষ্টা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে চলেছেন।
আজ বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফল করবার অব্যবহিত পরেই এ রাজ্যের আনাচে-কানাচে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপরে রাজনৈতিক হিন্দুদের সামাজিক ,মানসিক ,শারীরিক অত্যাচারের যে সমস্ত ঘটনাবলীর কথা সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে, তার পরিবেশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গত আট বছর ধরে সযত্নে লালিত সংখ্যালঘু প্রীতির মেকি ছদ্দবেশী ইমেজের ভীতর দিয়ে গড়ে তুলেছেন।
মমতার’ হাজি বিবি ‘সেজে, হিজাব পরিহিত অবস্থায় ,মোনাজাতরত ভঙ্গিমার ফটোশপের বিজ্ঞাপনগুলি সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের ভেতরে এই ধারণার সৃষ্টি করেছে যে ,জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কল্যান সাধনায় ব্রতী হওয়ার পরিবর্তে কেবলমাত্র মুসলমান সম্প্রদায়ের কল্যাণেই মমতা সব থেকে বেশি যত্নবান ।অথচ নানা ধরনের আর্থ-সামাজিক সমীক্ষার থেকে এই তথ্য উঠে এসেছে যে ,স্বাধীনতার পরবর্তী কাল থেকে আজ পর্যন্ত এ রাজ্যে যতগুলি রাজনৈতিক দলই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন ,তাঁদের ভিতর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে ই রাজ্যে মুসলমান সম্প্রদায় সব থেকে বেশি নিকৃষ্ট অবস্থার ভেতরে রয়েছেন।
মুসলমান সমাজের নিজের টাকা ওয়াকফের ভিতর দিয়ে মুসলমান সমাজের একটা ছোট অংশকে ,অর্থাৎ; ইমাম-মুয়াজ্জিনদের খুশি করবার তাগিদে মমতা দীর্ঘদিন ধরে ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। সেই ভাতা কে ঘিরেও নানা ধরনের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে ।এই অভিযোগ উঠছে যে ,মুসলমান সম্প্রদায়ের নিজের নানা ধরনের দান-খয়রাত থেকে পাওয়া টাকার থেকে ওয়াকফের ভিতর দিয়ে তাঁদের একটা ছোট অংশকে ভাতা হিশেবে দেয়া হলেও সেই অংশটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের স্থানীয় নেতৃত্বের কাটমানি খাওয়ার তাগিদে সরকার প্রদত্ত পুরো টাকাটা পর্যন্ত তাঁরা হাতে পায় না।
মুসলমান সমাজে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে এরাজ্যে অতীতে বামফ্রন্ট সরকার বহু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার অতীতের সেই গৌরবকে ধরে রাখার পরিবর্তে, রাজ্যের সরকার অনুমোদিত মাদ্রাসা এবং অ অনুমোদিত মাদ্রাসা যাকে ‘খারিজি মাদ্রাসা’ বলা হয় ,সেই সব মাদ্রাসাগুলিতে কার্যত লাল বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেনরাজ্যের তৃণমূল সরকার।
মুসলমান সমাজের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে চরম উদাসীনতার পরিচয় গত আট বছর ধরে রেখেছেন কার্যত তার স্বীকৃতি আজকে মমতা সরকারের প্রথম সারির মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির যে প্রস্তাবনা এসেছে ,তার ভিতর মুসলমান সমাজের ওই অংশের চরম অর্থনৈতিক দুর্বলতার বিষয়টি দিনের আলোর মতো আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে দেখা দিয়েছে।
গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়েই সাম্প্রদায়িকতার আগুন নিয়ে খেলবার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস নিয়েছিল। সেটি তাঁদের মতন করে সেটা অনেকটা সফল হতে শুরু করেছে। মমতা কার্যত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য টিকে একটি বহুমূল্য রেখাবের উপর প্রতিস্থাপিত করে এখানকার জল মাটি আগুন কে নিয়ে এক ভয়াবহ আত্মঘাতী খেলায় মেতে উঠেছেন।
এই প্রবণতা থেকে এখনই যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে রাজনৈতিক মোকাবিলার ভিতর দিয়ে প্রতিহত করতে না পারা যায় ,তাহলে আগামী দিনে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ,তা গোটা পূর্বাঞ্চল কে অতিক্রম করে অচিরেই সমগ্র ভারতবর্ষের পক্ষে এক প্রলয়ঙ্করী বিপদের বার্তা যে বয়ে আনবে সে বিষয়ে কারো কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *