প্রসঙ্গ সাম্প্রতিক বাংলাদেশ

এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে।বেদনাদায়ক সড়ক দুর্ঘটনা এবং তার জেরে দুটি শিশুর মৃত্যু- যা গভীর যন্ত্রণার বিষয়, সেই যন্ত্রণার বিষয়টিকেই ঢাল হিশেবে ব্যবহার করে সেদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে হটাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী যাবতীয় শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।গোটা বিশ্বজুড়ে আজ দক্ষিণপন্থার ভয়াবহ তান্ডব।সেই তান্ডবের মাঝে ও যাঁরা গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের শক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সম্প্রীতিকে যাঁরা চেতনায় লালন পালন করেন, সেই শক্তিকে কোনঠাসা করতে এক গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে।আজ থেকে সাত বছর আগে এমন ই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন আমাদের রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।আর আজ, সাত বছর পরে সেই রকম ই হিশহিশে ষড়যন্থ্রের শিকার হিশেবে বেছে নেওয়া হয়েছে গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনাকে।
যাঁরা আজ সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর দুঃখজনক ঘটনা নিয়ে আন্দোলনের নামে শেখ হাসিনাকে সে দেশের আসন্ন নির্বাচনে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত , তাঁদের মনে রাখা দরকার শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক চেতনার উজ্জ্বল উদাহরণ ই হলো তাঁদের এই আন্দোলন।অতীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান বা এরশাদ কিংবা খালেদা জিয়ার শাসন কালে সে দেশে বিরোধীদের এ ধরণের আন্দোলনের অধিকার ই ছিল না।আমরা ভুলে যেতে পারি না টোকাইদের কথা।আমরা ভুলতে পারি না নূর হোসেনের কথা।আজ শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলন দমাতে কোনো রকম রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের আশ্রয় নেন নি।যদিও সোশাল মিডিয়া সহ একাধিক গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি এই আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার সরকার ভূমিকাকে বিকৃত ভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপিত করে চলেছে।একশ্রেণীর সংবাদপত্র ও সেদেশে মুক্তি যুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে এই আন্দোলনের পেছন থেকে মদতদাতা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এবং মৌলবাদী শক্তি গুলির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়েছে।

দুঃখের বিষয় হলো; বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির দালাল হিশেবে এপার বাংলাতও কিছু কিছু শক্তি সক্রিয়।বাংলাদেশে এককালে যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে তাঁদের ‘৭২ এর সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী আনতে মদত দিয়েছিল, তাঁরাই আজ বামপন্থার নাম করে এই আন্দোলনকে মদত দিচ্ছে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার লক্ষ্যে।তেমনি ই এপার বাংলাতেও এন জি ও রাজ কে প্রসারিত করে একদল লোক নিজেদের বামপন্থী পরিচয় দিয়ে কলকাতার বুকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের সরকারের বিরুদ্ধে কেবল বিক্ষোভ ই দেখাচ্ছে না, তাঁদের উৎখাত করার দাবি ও জানাচ্ছে।কি চায় তাঁরা? মৌলবাদী শক্তি রাজ করুক আবার বাংলাদেশে? এভাবেই তাঁরা সুবিধা করে দিতে চাইছে ট্রাম্প, মোদিদের।ভুলে গেলে চলবে না; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের কুখ্যাত পাক মেজর জেনারেল নিয়াজীর নিজের ভাইপো ইমরান খান আজবাদে কাল পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন।
আমাদের বিশ্বাস; যে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাংলাদেশ কে প্রগতির পথে পরিচালিত করছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা , সেই বুদ্ধিমত্তা দিয়েই তিনি তাঁর দেশের এই আন্দোলনের ও একটা যুক্তিসঙ্গত সমাধানে পৌঁছবেন।যে সাহসের সঙ্গে পাকিস্থান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে নিজের দেশের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর শাস্তি দিয়েছেন, সেই সাহস এবং সততা ও দক্ষতার ভিতর দিয়েই এই আন্দোলনের ও সমাধান করবেন।
বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ঘটনাবলী সম্পর্কে ইতিমধ্যে ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের নঞর্থক মানসিকতা প্রকাশ্যে জানাতে শুরু করে দিয়েছে।আমেরিকা ছাড়াও তাঁদের ধামাধরা দেশগুলি প্রকাশ্যে অভিমত দিতে শুরু করেছে যে, বাংলাদেশ কতো খারাপ।এই গোটা ঘটনাবলীর ভিতরে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি, তাঁদের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির স্পষ্ট মদত আছে , সে কথা কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাঁদের মতে মত দেওয়া দেশ গুলি একটি বারের জন্যে ও বলছে না।গোটা ঘটনার দায় তাঁরা একতরফা ভাবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উপর।এই মানসিকতাটা টা বাংলাদেশের পরিমন্ডল কে অতিক্রম করে তাঁরা এ পার বাংলাতেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।এপার বাংলার ছাত্র সমাজের কিছু বিক্ষিপ্ত মানুষ জন আমেরিকার প্ররোচনার ফাঁদে পা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এবং তাঁদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে যথেচ্ছ গালিগালাজ করে চলেছেন।মূল জায়গা থেকে মানুষের দৃষ্টি কে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে আমাদের রাজ্যের তরুণ সমাজের একটা ছোট অংশ অংশীদার হয়ে পড়েছে– এটা গভীর যন্ত্রণার বিষয়।
সড়ক দুর্ঘটনা কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে আন্দোলন হচ্ছে , সেই আন্দোলন ই প্রমাণ করে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বনিয়াদকে।আজ দেশে মজবুত গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো আছে বলে ই এভাবে সরকার বিরোধী আন্দোলন সে দেশে সংগঠিত হওয়া সম্ভবপর হয়েছে।সে দেশে যদি গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো না থাকতো তাহলে কি বিরোধীর এভাবে কন্ঠস্বর ধ্বনিত হওয়া সম্ভবপর ছিল? সাম্প্রতিক অতীতে কি খালেদা জিয়ার শাসনকালে এই ধরণের কোনো আন্দোলন কল্পনা করা যেতো বাংলাদেশে?বিরোধী মতাদর্শ সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ ছিল সে দেশে বি এন পি- জামাত জোট সরকারের আমলে।বিরোধীদের জমায়েতের উপর তদানীন্তন শাসকের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার স্মৃতি এখনো বিশ্ববাসীর মন থেকে হালকা হয়ে যায় নি।সেই হামলার মূল লক্ষ্য ই ছিল তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী তথা আজকের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।সেই বিভৎস গ্রেনেড হামলার জেরে শেখ হাসিনা তাঁর শ্রবণক্ষমতা অনেকখানি ই হারিয়েছেন।
বাংলাদেশে আজ এই যে একটা অংশের মানুষের ভিতরে স্বাধীনতার চেতনার বিরোধী ভাবধারার বিকাশ এবং সে দেশের ভৌগলিক গন্ডিকে অতিক্রম করে সেই চেতনা আন্তর্জাতিক স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা– এই গভীর ষড়যন্ত্রের একটি ধারাবাহিকতা আছে।আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, জন্মলগ্ন থেকেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্তরে বহু দেশের চক্ষুশূল ছিল।বাংলাদেশের জন্মের পর তৎকালীন মার্কিন বিদেশ সচিব হেনরি কিসিঞ্জার সদ্য জন্ম নেওয়া দেশটিকে অভিহিত করেছিলেন ;” তলাবিহীন ঝুড়ি” হিশেবে।মার্কিন কর্তারা সেই সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সোভিয়েট ইউনিয়নের উজ্জ্বল উপস্থিতির নিরিখে , ভারতবর্ষের প্রত্যক্ষ ভূমিকা য় অবিভক্ত পাকিস্থান ভেঙে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম নেওয়া টা কে কোনো অবস্থাতেই বরদাস্ত করতে পারেন নি।সেই সময়ের মার্কিন বিদেশ সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের উক্তি আমেরিকার সেই না পছন্দের ই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।সেই না পছন্দের জের যে এখনো সমান ভাবেই বর্তমান তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আগ বাড়িয়ে মার্কিন কর্তাব্যক্তিদের কথার ভিতর দিয়েই আবার ও দিনের আলোর মতো পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে।

 

 

তপতী দাশ

One thought on “প্রসঙ্গ সাম্প্রতিক বাংলাদেশ”

  1. খুব ভালো লেখা হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ। এশিয়ার অন্যতম আর্থ-সামজিক, আর্থ-সাংসকৃতিক মান দন্ডে বর্তমান বাংলাদেশ এশিয়ার অনেক উন্নত দেশকে টক্কর দিতে পারে। আর এটা সম্ভব হয়েছে, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর দলের কয়েকজন প্রথম সারির নেতৃত্বের প্রচেষ্টায়। শেখ হাসিনা যে উচ্চতায় বংলাদেশকে নিয়ে গেছেন সেখান থেকে তাঁকে নামিয়ে আনা খুব সহজ হবে না। ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক ঝড় ঝাপটা সামলে আজকের সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম উদাহারণ বালাদেশ নামক রাষ্ট্রটি। যদিও আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। কারণ কায়েমি স্বার্থ ভারতের অন্যতম প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভূটানের আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হতে চাইবে। সেই স্ত্রক্তা ভারত তথা আমাদের রাজ্য ‘বাংলা’-র গণ তন্ত্রপ্রিয় ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষেরও প্রয়োজন আছে সম্ভবত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *